ইয়াওমুস ছুলাছা (মঙ্গলবার), ২০ অক্টোবর ২০২০

মুসলিমবিরোধী আন্দোলনের পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় ভারতীয় মিডিয়া

মুসলিমবিরোধী আন্দোলনের পথপ্রদর্শক ভারতীয় মিডিয়া

নিউজ ডেস্ক: গত মাসে ভারতের টেলিভিশনের ইতিহাসে অচিন্ত্যনীয় ঘটনা ঘটে গেছে। চল্লিশোর্ধ এক ব্যক্তি গেরুয়া ওয়েস্টকোর্ট পড়ে সুদর্শন টিভি নামের একটি সংবাদ চ্যানেলের স্ক্রিনে ঝড় তুলল। সে সুদর্শন নিউজের চেয়ারম্যান, ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং এডিটর ইন চিফ সুরেশ খান্ডেরাও চাভাঙ্কে।

২০০৭ সালে যাত্রা শুরুর সময় থেকে উগ্রপন্থী এবং হিন্দু চরমপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী হিসেবে পরিচিত এই সংবাদ চ্যানেলটি সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়ে ওঠে যখন এর মালিক ঘোষণা দেয় যে, ভারতীয় মুসলিমরা কিভাবে ‘কেলেঙ্কারির মাধ্যমে’ দেশের কঠিন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা উৎরে যাচ্ছে, সে বিষয়ে দশ পর্বের ধারাবাহিক প্রচার করবে তারা।

চাভাঙ্কে একটা নজিরবিহীন ভয়াবহ দাবি জানায় যাতে ভারতের সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায় মুসলিম তরুণদের অংশ নিতে দেয়া না হয়।

সাংবাদিক বেশধারী ৪৮ বছর বয়সী এই ধর্মান্ধ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) একজন সক্রিয় সদস্য, যে সংগঠনটি ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণার দাবি করে, যেখানে মুসলিমরা হবে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।

১৩ সেপ্টেম্বর চাভাঙ্কে একটি সংবাদ পোর্টালকে তার পরিকল্পনার ব্যাপারে বিস্তারিত জানায় কিভাবে তার চ্যানেল ভারতে হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এক পডকাস্ট সাক্ষাতকারে সে বলেছে, “আমার উদ্দেশ্য হলো ভারতকে উগ্র চরমপন্থী হিন্দু রাষ্ট্র করে তোলা। আমি বিস্তারিত বলবো না, তবে অতীতের ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি করা হবে না এবং এই সময় খুবই কাছে এসে গেছে”।

সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা

চাভাঙ্কে আর তার সংবাদ চ্যানেল সুদর্শন টিভি একমাত্র চ্যানেল নয় যারা ভারতের মুসলিমদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে, যেখানে জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ হলো মুসলিম এবং তারা দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু। করোনাভাইরাস ছড়ানোর নাম করে তাবলিগি জামাতের ধর্মপ্রচারকদের দায়ি করা থেকে শুরু করে সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভকালে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার অসহায় শিক্ষার্থীদেরকে অগ্নিসংযোগকারী, লুটেরা ও পাকিস্তানের মদদপুষ্ট পুতুল আখ্যা দিয়ে ভারতের টিভি নিউজ চ্যানেলগুলো রুয়ান্ডার মতো গণহত্যার পরিস্থিতি তৈরির দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।

সুদর্শন নিউজে দাবি করা হয়েছে যে, ভারতের সিভিল সার্ভিসে ভারতীয় মুসলিমদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তবে তথ্য মিলছে তার ঠিক বিপরীত। ২০০৬ সালে সাচার কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী সিভিল সার্ভিসে মুসলিম রয়েছে মাত্র ২.৩ শতাংশ, যেখানে তাদের জনসংখ্যা হলো ১৪%। ভারতের মুসলিমদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, এবং শিক্ষাগত অবস্থা বোঝার জন্য সব সম্প্রদায়ের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এই সাচার কমিটি গঠন করা হয়েছিল, যার প্রধান ছিলে দিল্লী হাই কোর্টের হিন্দু সাবেক প্রধান বিচারপতি রাজিন্দার সাচার।

গত বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসের জন্য মোট ৮২৯ জনকে নেয়া হয়, যাদের মধ্যে মুসলিম হলো মাত্র ৩৫ জন। এর অর্থ হলো সিভিল সার্ভিসে মুসলিমদের অংশগ্রহণ মাত্র ৪.২২ শতাংশ।

‘নয়া পাকিস্তান’

ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে যে ভয় সৃষ্টি করা হচ্ছে, সেটার ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস যে, মুসলিম জনসংখ্যা অস্বাভাবিক গতিতে বাড়ছে এবং শিগগিরই ভারতে হিন্দুদেরকে তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত করবে এবং ভারতকে নয়া পাকিস্তানে পরিণত করবে। অথচ ভারতে হিন্দুরা হলো জনসংখ্যার ৮২ শতাংশ। টিভি অ্যাঙ্কাররা প্রকাশ্যে দাবি করছে যে, ২০২৯ সালের পর কোন হিন্দু আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে না, কারণ অধিকাংশ ভারতীয় তখন মুসলিম থাকবে।

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময়ও হিন্দু উগ্রবাদী চরমপন্থীরা এই একই ভয়ের মনস্তত্বকে ব্যবহার করেছিল। ব্যাপক মাত্রায় অপপ্রচার চালানো হয়েছিল যে, মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা দেশের হিন্দু সংখ্যাগুরুদের জন্য মহাবিপর্যয়ের কারণ হবে। আজকের ভারতেও সেই একই অদ্ভুত যুক্তি ছড়ানো হচ্ছে। নিউজ অ্যাঙ্কাররা স্টুডিওগুলো থেকে চিৎকার করছে কিভাবে মুসলিমদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে হিন্দু জনসংখ্যার চরম অবনতি হবে।

জনসংখ্যার অবনতি

কিন্তু বাস্তবতা হলো গত ৪০ বছর ধরে ভারতে মুসলিমদের জনসংখ্যা ক্রমাগত কমছে। শুমারির তথ্য অনুযায়ী মুসলিমদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩২.৯ শতাংশ থেকে কমে ২৪.৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৮১-৯১ সালে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ছিল ৩২.৯%। ১৯৯১-২০০১ সালে এটা কমে ২৯.৩ শতাংশ হয় এবং ২০০১ থেকে ২০১১ এর সর্বসাম্প্রতিক শুমারি অনুযায়ী এটা আরও কমে ২৪.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, সরকারের নিজের হিসাবই বলছে যে, প্রতি ১০ বছরে ভারতে হিন্দুদের জনসংখ্যা যতটা বাড়ছে, সেটা দেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার সমান।

আসল উদ্দেশ্য

সব ভাষার টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতেই বহুদিন ধরে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। এর মাত্রা ক্রমাগত বেড়েছে কিন্তু এই অপপ্রচার বন্ধ করার জন্য কখনও কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। হিন্দুত্ববাদী ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ কর্পোরেট হাউজগুলোর অর্থায়নে পরিচালিত ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো ঘৃণার বণিক হয়ে উঠেছে।

মুসলিমদের ব্যাপারে একটা ঘৃণা তৈরির জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে। গড় হিন্দু জনগণকে আগামীর কর্মসূচির জন্য প্রস্তুত করার জন্যই এটা করা হচ্ছে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেভাবে বহু বছর ধরে চরম মিথ্যাচার আর অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, সেটা আগামীতে আরও খারাপ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। রুয়ান্ডার গণহত্যায় যে শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটা হলো ‘তেলাপোকা’। ভারতে বলা হচ্ছে ‘উঁইপোকা’। এই ঘৃণা ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হলো হিন্দুত্ববাদীদের কট্টর এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য মধ্যপন্থী গড় হিন্দুদের পক্ষে নেয়া।

Facebook Comments