ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার), ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

পাম অয়েলের অকল্পনীয় সুযোগ ও সম্ভাবনা

পাম অয়েলের অকল্পনীয় সুযোগ ও সম্ভাবনা

নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে পাম অয়েলে রয়েছে অকল্পনীয় সুযোগ ও সম্ভাবনা। যার মাধ্যমে দেশে ভোজ্য তেলের চাহিদা পূরণের পরও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও রয়েছে বলে মনে করছেন রাজশাহী বিসিএসআইআরের অয়েল, ফ্যাট অ্যান্ড ওয়েক্সেস রিসার্চ ডিভিশনের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার (পিএসও) মো. মইন উদ্দিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু পাম গাছের জন্য খুবই উপযোগী। সঠিকভাবে পামের চাষাবাদ, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে দেশে ভোজ্য তেলের স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন সক্ষম। সেই সঙ্গে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও পাম তেল রফতানি করে তেল উৎপাদনশীল দেশের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান সম্ভব বলে দাবি গবেষক মইন উদ্দিনের।

রাজশাহী বিসিএসআইআরের গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়া ও আফ্রিকান দেশগুলোতে পাম গাছ প্রচুর পরিমাণে থাকায় তারা দীর্ঘদিন ধরে এই পাম ওয়েল সিড থেকে তেল নিসরণ করে সেটি তাদের খাবার তেল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ফাটি অ্যাসিড ও কোলেস্টেরল থাকলেও তাতে ক্ষতি হচ্ছে না। পশ্চিমাদের আপত্তি ও নিরুৎসাহিতকরণের কারণ জানতে মালয়েশিয়ার বিজ্ঞানীরা পাম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এতে তারা দেখেন পামে আছে ট্রকোফেরোল এবং ট্রোকোট্রায়ানল যা মূলত ভিটামিন ‘ই’। এ ছাড়াও ট্রোকোট্রায়ানল ক্যানসার প্রতিরোধে খুবই শক্তিশালী ও কার্যকর একটি উপাদান। শুধুমাত্র এর কারণেই আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাম অয়েলের ব্যবহার বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

পামে কোলেস্টরেলের পরিমাণ শতকরা ১৩ পিপিএম (৫০ পিপিএমের বেশি কোলেস্টেরল শরীরের জন্য ক্ষতিকর) যা নেই বললেই চলে। পামে ফ্যাটি অ্যাসিড বা স্যাটুরেটেড অ্যাসিডের পরিমাণ অনেক বেশি থাকলেও ক্ষতি নেই বলে গবেষণায় পেয়েছেন মালয়েশিয়ান বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় পাওয়া গেছে, পামে রয়েছে ট্রাইগ্লিসারাইডের ৩টি স্তর। প্রথম ও দ্বিতীয় স্তর শরীরের জন্য খুবই উপযোগী। কারণ, ট্রাইগ্লিসারাইডের প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরের স্যাটুরেটেড অ্যাসিড ভেঙে যায়। অন্য দিকে, তৃতীয় স্তরের স্যাটুরেটেড অ্যাসিড ভাঙে না তাই তাতে ক্ষতিও নেই। আবার পুষ্টিগুণের দিক থেকে গাজরের তুলনায় পামে রয়েছে ১৫ গুণ বিটা-ক্যারোটিন, টমেটোর তুলনায় ৩০০ গুণ বিটা-ক্যারোটিন। পাম অয়েলের এই বিটা-কারোটিন শরীরে ভিটামিন ‘এ’ উৎপাদনে সহায়তা করে। ট্রোকোফেরল ও ট্রোকোট্রায়ানলে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘ই’। ট্রোকোট্রায়ানল ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে। যার কারণে পাশ্চাত্যে এখন পাম ওয়েলের ব্যবহার প্রচুর বেড়েছে।

আবার, পামের বীজ থেকেও তেল উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু বীজে স্যাটুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড অধিক পরিমাণ হওয়ায় সেটা দিয়ে তেল উৎপাদন করা হয় না। বীজগুলো ব্যবহার হয় সাবান ও প্রসাধনী তৈরির কোম্পানিগুলোতে। কাজেই পামের প্রতিটি উপাদানেই রয়েছে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ।

রাজশাহী বিসিএসআইআরের অয়েল, ফ্যাট অ্যান্ড ওয়েক্সেস রিসার্চ ডিভিশনের প্রিন্সিপাল সান্টিফিক অফিসার (পিএসও) মো. মইন উদ্দিন বলছেন, নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশে পাম গাছ অনুপযোগী বলে মনে করতেন বাংলাদেশের গবেষকরা। কিন্তু সম্প্রতি এক গবেষণা দেখা গেছে বাংলাদেশের মাটি, আদ্রতা, তাপমাত্রা ও গড় বৃষ্টিপাত পাম গাছের বৃদ্ধির জন্য খুবই উপযোগী। মালয়েশিয়ায় যেখানে এক কাদি পামের ওজন ৪০ কেজি হয়, সেখানে বাংলাদেশের একটি কাদি পামের ওজন ৬০ কেজির বেশি হয়ে থাকে। কারণ, অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশের পাম ফল আকারে বড়। আবার, পাম গাছে বছরে ৩ বার ফল নামানো যায়। এ ছাড়া সারা বছরই গাছে পাম ফল ধরে বলে জানান গবেষক মইন উদ্দিন।
আরঅ্যান্ডডি (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) প্রকল্পের আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে রাজশাহী বিসিএসআইআর গবেষণাকেন্দ্রে এই পাম অয়েলের গবেষণার প্রকল্পটি অনুমোদিত ও চালু হয়। বিসিএসআইআরের মূল লক্ষ্য দুটি। প্রথমটি হচ্ছে বাংলাদেশে পাম ফলের পুষ্টি গুণ সম্পর্কে জানা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে পাম গাছের প্রজনন, বৃদ্ধি ও উৎপাদন কেমন হবে সেই সম্পর্কে জানা। বর্তমানে গবেষক মইন উদ্দিন দুটি বিষয়েই বেশ সন্তোষজনক ফলাফল পেয়েছেন।

প্রকল্প শুরুর জন্য গবেষক মইন উদ্দিন প্রথমে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল সেনা ক্যাম্প থেমে পাম গাছের চারা ও তার ফল সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে তিনি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাম গাছ ও তার ফল সংগ্রহে নেমে পড়েন। রাজশাহীর বেলপুকুর এলাকার পাম গাছ থেকে পাম সংগ্রহ কওে প্রথম গবেষণায় ভালো ফলাফল পান তিনি। ভালো ফলাফল পাওয়ায় পরবর্তীতে নওগাঁর ফজলুল হক নামের এক কলেজ শিক্ষকের কাছে থেকে ৩০০টি চারা এনে ল্যাবরেটরির ৩ একর পতিত জমিতে রোপণ করেন। বর্তমানে চারার বয়স ৩ বছর চলমান। চারা গাছ থেকে ফল পেতে সময় লাগবে প্রায় তিন বছর। ইতোমধ্যে সেই পাম গাছগুলোতে ফল ধরতে শুরু করেছে। তবে সে ফল এখনও ব্যবহার উপযোগী হয়ে ওঠেনি।
কাজেই কালক্ষেপণ না করে গবেষণার সুবিধার্থে তিনি টাঙ্গাইলের ঘাটাইল সেনা ক্যাম্পে ১৯৭৮ সালে লাগানো পাম গাছ থেকে আবারও ফল সংগ্রহ করেন। সেই পাম ফল থেকে তেল বের করার পদ্ধতি এবং তার পুষ্টি ও গুণাগুণ সম্পর্কে গবেষণা শুরু করেন।

তিনি জানান, প্রথমে ফল থেকে তেল সংগ্রহের বিষয়টি বেশ কঠিন ছিল। পাম ফলের বিচি ও উপরের মাংসল অংশ থেকে তেল পাওয়া যায়। মূলত মাংসল অংশের নির্যাস থেকেই ভোজ্যতেল পাওয়া যায়। মালয়েশিয়ান ও আফ্রিকান স্থানীয়রা ব্লিচিং পদ্ধতিতে পাম ফল থেকে তেল বের করে। গুগল ও ইউটিউবে বিভিন্ন তথ্যের মাধ্যমে আমাদের ল্যাবেও প্রাথমিকভাবে ব্লিচিং পদ্ধতিতে তেল বের করা হয়েছে। পরবর্তীতে আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টেজে কাজটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং মেশিন পদ্ধতির মাধ্যমে তেল উৎপাদনের চেষ্টা করছি। তিনি জানান, ময়মনসিংহ বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে এককভাবে কাজটি করা হচ্ছে। মেশিনটি তৈরি হলে সেটি দিয়ে ট্রায়ালের পর তার সঠিকতা যাচাইপূর্বক পুরোপুরি ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্টেজে পাম তেলের উৎপাদনে যাওয়া যাবে।

বাংলাদেশের পাম তেলের সম্ভাবনার বিষয়ে তিনি জানান, বর্তমানে সরকার ১২-১৫ হাজার কোটি টাকার তেল আমদানি করে। তার ৬০% পাম ওয়েল এবং বাকিটা অন্যন্য ভোজ্যতেল। এ ছাড়াও ভোজ্যতেলের দিক থেকে বর্তমান বিশে^ পাম তেল প্রথম অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ুর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পার্থক্য করলে দেখা যায় মালয়েশিয়ায় তাপমাত্রা ২৫-৩০ সেন্টিগ্রেড সেখানে বাংলাদেশে ১৫-৩৫ সেন্টিগ্রেড, আবার গড় বৃষ্টিপাতে মালয়েশিয়ায় ১৮৫০ মিমি অপরদিকে বাংলাদেশে ৩০০০ মিমি। আদ্রতার দিক থেকে মালয়েশিয়ায় ৮০-৯০% একই সঙ্গে বাংলাদেশেও ৮০-৯০%। অন্যদিকে ভূমির উর্বরতা মালয়েশিয়ার চেয়ে বাংলাদেশে অনেক বেশি।

সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, এই উপযোগিতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশে অনাবাদী, পতিত জমি এবং রাস্তা কিংবা রেল লাইনের ধার ঘেঁষে পামের আবাদ করলে বাংলাদেশ পাম তেলে শুধু সমৃদ্ধই হবে না, বরং বিদেশে তেল রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ও তেল রফতানিতে শীর্ষস্থানও অর্জন করা সম্ভব। এ ছাড়া বাংলাদেশে দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে প্রচুর অনাবাদী জমি। চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ বিভাগীয় অঞ্চলগুলোর অনাবাদী জমিগুলোতে পাম চাষে যেমন সম্ভাবনা রয়েছে তেমনি ওই অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু পাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী বলে মনে করছেন গবেষক মো. মইন উদ্দিন।

পাম ওয়েলের গবেষণা ও বাংলাদেশে পাম ওয়েলের সম্ভাবনার বিষয়ে রাজশাহী বিসিএসআইআরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইব্রাহিম খলিল বলছেন, পাম অয়েলের জন্য মালয়েশিয়াকে বিশে^র শীর্ষ স্থানীয় দেশ ধরা হয়। অথচ, রাজশাহী বিসিএসআইআরের আরএনডি প্রকল্পের আওতায় পাম অয়েল সম্পর্কিত একটি গবেষণায় আমরা দেখেছি আমাদের দেশের জলবায়ু ও মাটির উর্বরতা মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশের চাইতেও বেশি উপযোগী। প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ ও সহযোগিতা পেলে হয়ত এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশও হতে পারে তেল উৎপাদনে বিশে^র শীর্ষ স্থানীয় দেশ।

Facebook Comments