ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার), ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

কাশ্মীরের মানুষের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেই চলছে ভারত

এখনো কাশ্মীরের নাগরিক স্বাধীনতা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সাইফুদ্দিন সুজ গৃহবন্দী নন। তাকে স্রেফ তার বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হচ্ছে না। ৮২ বছর বয়স্ক এই লোক একসময় উত্তর কাশ্মীর থেকে দিল্লীর জাতীয় পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করতেন। তিনি মনমোহন সিংয়ের আমলে ৫ বছর মন্ত্রী ছিলেন। ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারতীয় পার্লামেন্ট জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা বাতিল করার পর থেকে সাইফুদ্দিন বাড়িতে অবস্থান করছেন। তারা তাকে বলেছিলেন, ‌আপনি গৃহবন্দী। তার পরিবার তার মুক্তির জন্য আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিল। তার বিরদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না। কিন্তু তবুও সুপ্রিম কোর্ট আবেদনটি খারিজ করে দেয়। কারণ কর্তৃপক্ষ সম্মানিত আদালতকে জানিয়েছিল যে সাইফুদ্দিন কখনো আটক বা গৃহবন্দী ছিলেন না। সাংবাদিককেরা যখন এই সুখবর শোনানোর জন্য তার বাড়িতে যায়, তিনি তখন বেড়ার ওপার থেকে তাদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তখনই উর্দি পরিহিত সৈন্যরা তাকে সরিয়ে নেয়।

সরকার নির্লজ্জভাবে আদালতকে মিথ্যা বলেছিল। এতেই বোঝা যায়, ভারত কিভাবে কাশ্মীরের ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং এখানকার জনসাধারণের অধিকারের ব্যাপারে সরকার কতটুকু আন্তরিক। রাজ্যটির বিশেষ অবস্থা অনেক দিন ধরেই ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপিকে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। তারা ১৯৪৭ সালে কাশ্মীরের অংশবিশেষ পাকিস্তানের দখলে নেয়াকে অপমানজনক ঘটনা মনে করে। আরো খারাপ বিষয় হলো, ভারতীয় অংশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ দীর্ঘ দিন ধরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ, প্রায়ই ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, সীমাহীন বিদ্রোহ ঘটে। সবচেয়ে ক্রুদ্ধকর বিষয় হলো, কৃতজ্ঞতাবোধ সত্ত্বেও অন্য রাজ্যের চেয়ে তারাই বিশেষ স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছিল গত বছর পর্যন্ত।

স্বায়ত্তশাসন বাতিল ও রাজ্যটিকে দুটি অংশে ভাগ করে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার মোদির সিদ্ধান্তের নেপথ্যে ছিল তার সমর্থকদের সন্তুষ্ট করা। এটি কাশ্মীরীদের ক্ষুব্ধ করেছে। সরকার ওই আদেশের সাথে সাথে স্থানীয় রাজনীতিও স্থগিত করে, অনেক নাগরিক অধিকারও স্থগিত করে। এর সমাপ্তির কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না।

এমনকি ওই পরিবর্তনের আগেই কাশ্মীরে প্রায় ৫ লাখ সৈন্য মোতায়েন করা হয়। নতুন আদেশ বাস্তবায়নের জন্য পাঠানো হয়েছিল ৩৫ হাজার। ফোন লাইন ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। কেবল রাজনীতিবিদ নয়, ব্যবসায়ী ও অন্যান্য প্রখ্যাত নাগরিকদের আটক করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার লোককে আটক করা হয়। সব ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। সরকার বলছে, পাকিস্তান-সমর্থিত সন্ত্রাসীদের রুখতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকার দাবি করছে, সরকার সাধারণ কাশ্মীরীদের মতপ্রকাশে কোনো বাধা দিচ্ছে না। কিন্তু বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাইফুদ্দিনের ঘটনা, ভিডিও ফুটেজ সরকারের দাবির বিপরীত কথাই বলছে। ১৩ মাস পরও সরকার আরোপিত বেশির ভাগ বিধিনিষেধ এখনো অব্যাহত রয়েছে।

ইন্টারনেট ফিরলেও সেটা নিয়মিত নয় এবং কাশ্মীরের অনেক অংশে কেবল ২ জি পরিষেবা পাওয়া যায়। ভারতের অন্য কোনো অংশে এমন অবস্থা নেই। আবার ২৯ আগস্ট আশুরা উপলক্ষে শিয়ারা একটি তাজিয়া মিছিল বের করতে চাইলেও পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় শটগানের গুলিবর্ষণ করে। একে কয়েক ডজন লোক আহত হয়। তাদের কয়েকজন অন্ধ হয়ে গেছে।

সারা কাশ্মীরে শত শত বাঙ্কার তৈরী করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর যানবাহনগুলো মহাসড়ক ধরে ছুটাছুটি করছে। তারা বেসামরিক যানবাহনগুলোর চলাচল বন্ধ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চেকপয়েন্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, ড্রাইভারদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গাড়ি থামিয়ে রাখতে বলা হচ্ছে।

আবার কঠোর নির্যাতনমূলক আইন নিরাপত্তা বাহিনীকে জবাবদিহিহীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। কঠোর পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট যেকোনো সময় যে কাউকে গ্রেফতার করার সুযোগ দিয়েছে। আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ অ্যাক্টের ফলে কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। আমর্ড ফোর্সেস অ্যাক্টের বলে সৈন্যদের দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। মে মাসে পুলিশ ও সৈন্যরা উত্তর কাশ্মীরে একটি গ্রাম তছনছ করার দৃশ্যে দেখা যায়। তাদেরকে নারী পুরুষদের প্রহার করতে, দোকান-পাট লুট করতে মালামালে অগ্নিসংযোগ করতে দেখা যায়। তবে বদলা নিতে লোকজন পাথর নিক্ষেপ করে। এক সিনিয়র অফিসার পাথরের আঘাতে আহত হন। ওই ভিডিও ফুটেজটি না থাকলে পুরো ঘটনাই অগোচরে থেকে যেত।

এর ফলে কর্তৃপক্ষ তথ্য প্রবাহ থামাতে উৎসাহিত হচ্ছে। গত জুনে প্রবর্তিত নতুন মিডিয়া নীতি অনুযায়ী, ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ কোনো কিছু প্রকাশ করলে সরকার শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। সামাজিক মিডিয়ায়, সরকারের ভাষ্যমতে রাষ্ট্রবিরোধী, পোস্টে কারণে প্রায় ৩০০ তরুণকে, তাদের বেশির ভাগই কিশোর, আটক করা হয়। তাদের অনেককে পেটানো হয়, অনেককে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয যে তারা আর রাজনৈতিক কোনো পোস্ট দেবে না।

এসবই করা হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য। লকডাউনের কারণে ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। গত বছর স্কুল খোলা ছিল মাত্র ২০ দিন। ইন্টারনেটে বিঘ্ন থাকায় অনলাইনেও শিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয়নি।

ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে অভিবাসীদের ঢলে কাশ্মীরীদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে তারা নিজ দেশেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে যাবে। তাদের ভয় প্রশমন না করে মোদি কাশ্মীরী স্বায়ত্তশাসন বাতিলকে উদযাপন করেছে বিধ্বস্ত একটি মসজিদের স্থানে নতুন একটি মন্দির নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে।

Facebook Comments