ইয়াওমুল জুমুআ (শুক্রবার), ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

লাইসেন্স নবায়ন না করলেই বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ

লাইসেন্স নবায়ন না করলেই বেসরকারি হাসপাতাল বন্ধ

নিউজ ডেস্ক: আগামী ২৩ আগস্টের মধ্যে বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন না করলে তাদের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। শনিবার (০৮ আগস্ট) অধিদফতরের টাস্কফোর্সের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। লকডাউনের মধ্যে রিজেন্ট হাসপাতালের অনিয়মের পরই সম্প্রতি নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এরপরই লাইসেন্সবিহীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে মাঠে নামে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা। এতে দেখা যায় বারডেম, আনোয়ার খান মডার্ন, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালসহ দেশের সুপরিচিত বিভিন্ন হাসপাতাল লাইসেন্স নবায়ন না করেই চিকিৎসা সেবা চালিয়ে যাচ্ছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে টাস্কফোর্সের সভায় আগামী ২৩ আগস্টের পর লাইসেন্সবিহীন সব হাসপাতাল বন্ধের সিদ্ধান্ত নিল স্বাস্থ্য অধিদফতর।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন বাধ্যতামূলক হলেও হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো এসবের তোয়াক্কা করে না, নানাভাবে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলে সবকিছু।

সূত্র মতে, ২০১৮ সালে লাইসেন্স ও নবায়নের জন্য অনলাইনে আবেদনের পদ্ধতি চালু হয়। কিন্তু তাতে কোনও একটি শর্ত যদি পূরণ না হয় তাহলে রেজিস্ট্রেশন হয় না, নবায়নও হয় না। অনেকে ঠিকমতো শর্ত পূরণ করতে না পেরে আবেদন করছে না বলেও জানা গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তালিকা অনুযায়ী, দেশে মোট ১৭ হাজার ২৪৪টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা বিভাগে পাঁচ হাজার ৪৩৬টি, চট্টগ্রাম বিভাগে তিন হাজার ৩৭৫টি, রাজশাহীতে দুই হাজার ৩৮০টি, খুলনায় দুই হাজার ১৫০টি, রংপুরে এক হাজার ২৩৬টি, বরিশালে ৯৫৭টি, ময়মনসিংহে ৮৭০টি এবং সিলেটে ৮৩৯টি। এসবের মধ্যে অনলাইনে লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করেছে ১০ হাজার ৯৪০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। লাইসেন্স রয়েছে মাত্র চার হাজার ৩৮৭টির। আর অধিদফতরের পরিদর্শনের অপেক্ষায় রয়েছে এক হাজার ৫২৫টি। বিভিন্ন শর্ত পূরণ না করতে পারায় ঝুলে রয়েছে চার হাজার ৫২৬টি।

অধিদফতর বলছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ। আর লাইসেন্সই নেই শতকরা ১০ শতাংশের। লাইসেন্স ছাড়াই এসব হাসপাতাল ক্লিনিক বাণিজ্য করছে বছরের পর বছর। মূলত ২০১৮ সালের পরই দেশের অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স করা এবং নবায়নে শিথিলতা আসে। তবে এজন্য জনবল সংকটও কিছুটা দায়ী বলে মন্তব্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের। তারা বলছেন, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কেবল নোটিশ ও পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া ছাড়া আর কোনও পদক্ষেপ নিতে পারে না স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরও বলছে, তাদের জনবল সংকটের কারণে সমস্যায় পড়তে হয়। একজন পরিচালকের অধীনে একজন সহকারী পরিচালক ও দুই জন মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে তাদের হাসপাতাল পরিদর্শনের কাজ চলে।

লাইসেন্স নিতে শর্ত

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন ফি এবং নিবন্ধন নবায়ন ফি পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। অপরদিকে, বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ থেকে ৫০ শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নবায়ন ফি ৫০ হাজার টাকা, ৫১ থেকে ১০০ শয্যার জন্য এক লাখ টাকা, ১০০ থেকে ১৪৯ শয্যার জন্য দেড় লাখ টাকা, আর ২৫০ শয্যার জন্য নির্ধারণ হয় দুই লাখ টাকা।

একইভাবে একই শয্যা সংখ্যা ধরে জেলা হাসপাতালগুলোর জন্য ধরা হয় ৪০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা ও এক লাখ টাকা। উপজেলা পর্যায়ে একই শয্যা সংখ্যা ধরে ফি নির্ধারণ হয় ২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও এক লাখ টাকা করে।

তবে এসব হাসপাতালে কমপক্ষে তিন জন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয় জন নার্স ও দুই জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকতে হয়। প্রতিটি শয্যার জন্য থাকতে হয় ৮০ বর্গফুট জায়গা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নারকোটিকসের লাইসেন্স থাকতে হবে। এরসঙ্গে আরও দরকার হবে ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (টেক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর) ও বিআইএন (বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর), সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র। তবে শয্যা সংখ্যা বেশি হলে আনুপাতিক হারে জনবল থাকতে হবে। আবেদনের ভিত্তিতে অধিদফতরের টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে লাইসেন্স দেবে।

নবায়ন না করলে কিছু হয় না!

শর্ত পূরণ ছাড়া লাইসেন্স নিতে পারবে না কেউ। আবার লাইসেন্সের শর্ত ভাঙলে বা নবায়ন না করলে সেটি বাতিলও হতে পারে। কিন্তু লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা নেই তেমন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ২০১৮ সালে ঢাকার ৩০টি বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ১৫ দিনের জন্য সাময়িক বন্ধ রেখেছিল অধিদফতর, কিন্তু সেগুলো পুনরায় চালু হয়েছে। তার কোনও ফলোআপ করা হয়নি। গত দুই বছরে একটি মাত্র হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর ডা. কামরুল হাসান খান বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক চলে দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেগুলেশন্স) অর্ডিন্যান্স-১৯৮২-এর অধীনে। কিন্তু আইন বা বিধি বা নিয়ম সেটা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অথচ হাসপাতাল-ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার আপডেটেড থাকতেই হবে, এখানে কোনও কম্প্রোমাইজ চলবে না।

তিনি বলেন, আমি একজন প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে পারি, ল্যাবরেটরি ব্যাঙের ছাতার মতো ঢাকা শহরের আনাচে কানাচে। এই জায়গাগুলোতে সংস্কার হয় না। অথচ সময়, মানুষের চাহিদা, দেশের অগ্রগতির সঙ্গে সংস্কার, আধুনিকতা প্রয়োজন হয়। তাই স্বাস্থ্য অধিদফতরকে ঢেলে সাজাতে হবে। একই সঙ্গে তাকে কিছু স্বায়ত্তশাষিত ক্ষমতাও দিতে হবে। তাদের কাজের ধরন বদলাতে হবে।

Facebook Comments