ইয়াওমুস ছুলাছা (মঙ্গলবার), ২৪ নভেম্বর ২০২০

লকডাউনের ফল: ‘স্কুল বিক্রয় হইবে’

চাকরি আছে, বেতন নাই

নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘বিক্রয় হইবে, হাই স্কুল, প্লে-দশম শ্রেণি চলমান, ৪৫০ জন শিক্ষার্থীসহ’ রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে বিদ্যুতের খুঁটিতে এমন বিজ্ঞাপন দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে। এ বছরও বিজ্ঞাপনটি ঝুলছে নানা স্থানে। স্কুলটি বিক্রি করতে মরিয়া এর প্রতিষ্ঠানমালিক। লকডাউনের কারণে আরও বেসামাল অবস্থায় রয়েছেন।

বিক্রি বা হস্তান্তরের বিজ্ঞাপন দেওয়া ভিশন রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজটি রাজধানীর রামপুরার উলন রোডে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ রানার কাছে স্কুল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সময় শিক্ষকদের বেতন দিতে না পারায় এমন উদ্যোগ নিয়েছি। তবে কেউ কিনবেন কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি তিনি।

শুধু এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির বিক্রির বিজ্ঞাপনই নয়, অনেকেই বিক্রি বা হস্তান্তর করতে না পেরে আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম বিক্রি করে ভাড়া মিটিয়ে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিচ্ছেন। এদের মধ্যে রয়েছে মালিবাগের ঢাকা ক্যাডেট স্কুল।
এ বিষয়ে কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশন থেকে বলা হচ্ছে- দীর্ঘ বন্ধে রাজধানীর কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, এমন বিজ্ঞাপন তারই উদাহরণ।

বাংলাদেশ কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মিজানুর রহমান জানান, রাজধানীর মলিবাগের ঢাকা ক্যাডেট স্কুলটি ভাড়া মেটাতে না পেরে সরঞ্জাম বিক্রি করে দিয়েছে। ভাড়া করা ভবনটিও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সরঞ্জাম বিক্রি করে বকেয়া ভাড়া মেটানো সম্ভব না হওয়ায় অগ্রিম জমা রাখা টাকা থেকে বাড়ির মালিককে ভাড়া পরিশোধ করে সাতক্ষীরায় চলে গেছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাইদুর রহমান।

চলমান পরিস্থিতিতে মালিকানা হস্তান্তরের চেষ্টায় থাকা জুরাইন আইডিয়াল কিন্ডার গার্টেনের মালিক মোশাররফ হোসেন বলেন, শিক্ষকদের বেতন দিতে পারছি না। তবে চেষ্টা চালাচ্ছি প্রতিষ্ঠানটি চালিয়ে নেওয়ার। প্রতিষ্ঠান হস্তান্তরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সম্মান বাঁচাতে প্রতিষ্ঠানটি হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছিল।’

কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, বেকারত্ব ঘোচাতে অনেকেই রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া ও মহল্লায় কিন্ডার গার্টেন চালু করেছিলেন। অনেকে এটিকে ব্যবসা হিসেবেও নিয়েছিলেন। কিন্ডার গার্টেন মালিকরা বলছেন, কে জানতো প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। অনেকেই কিন্ডার গার্টেন স্কুল পুরোপুরি বন্ধের প্রস্তুতি নিয়েছেন।

বাড্ডা এলাকার একটি প্রতিষ্ঠান ভিশন কিন্ডার গার্টেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে মালিকপক্ষ। অধ্যক্ষ সামসুল বলেন, আমরা কষ্ট করে স্কুলটি চালিয়েছি। প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ৪০০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। বাড়িভাড়া দিতে হয় মাসে ৩০ হাজার টাকা। কয়েক মাসের ভাড়া বাকি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের বেতনই দিতে পারছি না। পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে স্কুল পরিচালনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকারের কাছে আমরা এ জন্য বিশেষ প্রণোদনা চাই।

কিন্ডার গার্টেন মালিকরা বলছেন, দেশের ছয় লাখ শিক্ষকের বেশিরভাগই বেকার হয়ে পড়বেন। আর এক কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে ভিন্ন স্কুলে গিয়ে ভর্তি হতে হবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।
কিন্ডার গার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব মিজানুর রহমান বলেন, লকডাউন দীর্ঘ হলে দেশের ৭০ শতাংশ কিন্ডার গার্টেন বন্ধ হয়ে যাবে। দেশে ৬ লাখ শিক্ষক বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এ অবস্থায় বেশিরভাগ কিন্ডার গার্টেন শিক্ষকদের বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে হচ্ছে। জাতীয় স্বার্থে বিশেষ প্রণোদনা দিয়ে হলেও প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখার আহ্বান জানান তিনি।

Facebook Comments