ইয়াওমুল আহাদ (রবিবার), ২৯ মার্চ ২০২০

স্থলবন্দরে ১৪ দুর্নীতির উৎস

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিম বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের (স্থলবন্দরগুলো) ১৪টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে। বুধবার সচিবালয়ে এসে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর হাতে তুলে দেন দুদকের কমিশনার মোজাম্মেল হক খান।

কমিশনার বলেন, দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান আইন, বিধি-বিধানের পদ্ধতিগত ত্রুটি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব এবং জনবল সংকটের কারণে যে সব দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি হয় এর উৎস চিহ্নিতকরণসহ এই উৎসগুলো বন্ধে বা প্রতিরোধে বাস্তবতার নিরিখে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে সেই বিষয়ে সুপারিশ দিতে ২৫টি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করা হয়। স্থলবন্দরগুলোর আইন, বিধি, পরিচালন পদ্ধতি, সরকারি অর্থ অপচয়ের দিকসমূহ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করে এই প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে সুপারিশ দিতে কমিশনের একজন পরিচালকের নেতৃত্বে একজন উপপরিচালক এবং একজন সহকারী পরিচালকের সমন্বয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করা হয়। ইতোমধ্যে ১৬টি রিপোর্ট ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছি।’

তিনি আরও জানান, এই প্রাতিষ্ঠানিক টিম অনুসন্ধানকালে স্থলবন্দরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তা এবং এ বিষয়ে যারা সম্যক ধারণা রাখেন তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করেন। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক টিম স্থলবন্দরগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কিত বিভিন্ন দৈনিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যসহ ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক বিবৃতি, নিরীক্ষা ও অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দুর্নীতির উৎস ও ক্ষেত্র চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধে সুপারিশমালা প্রতিবেদন আকারে কমিশনে দাখিল করে।

মোজাম্মেল হক খান বলেন, আমি অকপটে স্বীকার করছি এটি বিশাল কোনো গবেষণা কাজ নয়। কোন জায়গায় দুর্নীতি হয় এমন ১৪টি জায়গার কথা আমরা মোটামুটি বলার চেষ্টা করেছি। এ উৎসগুলো যদি আমরা বুঝতে পারি আমাদের বিশ্বাস সেসব জায়গায় যদি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অধিকতর নজরদারি করেন, দায়িত্ব যদি আরেকটু সুচারুভাবে পালনের চেষ্টা করেন, তাহলে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য এটি ব্যাপক কাজ হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। এ কাজটি করার জন্য আমরা ২৮টি সুপারিশমালা দেয়ার চেষ্টা করেছি।

তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এটি অকাট্য কোনো বিষয় নয়, আবার এটি সামান্য বলে ফেলে দেয়ার বিষয়ও নয়। এটি একটি দলিল, আমরা বিশ্বাস করি মন্ত্রণালয় এটি বিবেচনায় নেবে। বিবেচবনায় নিলে দেশের জন্য লাভজনক হবে, এ বিশ্বাস থেকে আমরা এটা দিচ্ছি।

স্থলবন্দরে দুর্নীতির ১৪টি উৎস তুলে ধরে দুদক কমিশনার বলেন, অধিকাংশ স্থলবন্দরের বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল। অপ্রতুল নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বন্দর ও কাস্টমসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় প্রায়শই বিনা শুল্কে আমদানিকৃত মালামাল বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

স্থলবন্দরগুলোর কেনাকাটায় সরকারি ক্রয় আইন ও বিধির যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় স্থানীয় ব্যক্তিরা নানাভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে থাকেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ্রহণ করে থাকেন।

আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে লোকবল নিয়োগ ও বেতন দেয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ তদারকি ও স্বচ্ছতা না থাকায় কাজে উপস্থিত ও অনুপস্থিত সব শ্রমিকের নামে বিল উত্তোলন করার অভিযোগ রয়েছে বলে জানান দুদক কমিশনার।

তিনি আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই স্টেশনে কর্মরত থাকায় বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বন্দরকেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের এক ধরনের সখ্যতা গড়ে ওঠার অভিযোগ পাওয়া যায়।

মালামাল হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় অযোগ্য ঠিকাদাররা কাজ পেয়ে থাকে।

বিধি-বিধানের তোয়াক্কা না করে দ্রুত পণ্য ছাড়করণের মাধ্যমে দুর্নীতি হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের অভাবেও কোনো কোনো সময় দুর্নীতির উদ্ভব ঘটে।

আমদানিকারক ও কাস্টমস বিভাগ সূত্রে প্রায়শই বন্দরের শেড থেকে মালামাল চুরির অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বড় কাজকে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত কোটেশনের মাধ্যমে কার্য সম্পাদনের অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রতিযোগিতামূলক দরের পরিবর্তে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে কার্যাদেশ প্রদানের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়েছে।

স্থলবন্দরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন এবং বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রায়ই আঞ্চলিকতা বা এলাকাপ্রীতি ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় গ্রহণ করে পছন্দসই ব্যক্তিদের অনৈতিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন বা সিবিএর পদাধিকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অর্পিত দায়িত্ব পালন না করে কমিশন বাণিজ্য ও চোরাই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আঁতাত করে অযোগ্য ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অংকের উৎকোচ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

স্থলবন্দরগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি, হয়রানি, পেশাদারিত্বের অভাব এবং বন্দরের অভ্যন্তরে নানা অসামাজিক কর্মকা- পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

বিভিন্ন স্থলবন্দরের অফিস ভবন, শেড, ইয়ার্ড ও ওয়েব্রিজ স্কেলে বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থানীয়ভাবে ‘টেন্ডুল’ নামের ভাড়া করা বহিরাগত লোকদের দিয়ে দাফতরিক কাজ করিয়ে থাকেন। যা সম্পূর্ণ অবৈধ এবং এসব টেন্ডুলদের মাধ্যমে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করে থাকেন। একই ব্যক্তিকে বারবার বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনা বোর্ডের খ-কালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে বলেও দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

Facebook Comments