ইয়াওমুল ইসনাইন (সোমবার), ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

ফসলের উৎপাদন বাড়লেও বাড়েনা হিমাগার

ফসলের উৎপাদন বাড়লেও বাড়েনা হিমাগার

নিজস্ব প্রতিবেদক: বর্তমানে যে পেঁয়াজ বাজারে ৯০-১শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬-৭ মাস আগে উৎপাদন মৌসুমে এই পেঁয়াজই কৃষক ৮-১২ টাকায় বিক্রি করে নিঃস্ব হয়। অথচ গুণে মানে আমাদের দেশের পেঁয়াজ অনেক ভাল মানের। কিন্তু এরপরও দেশের পেঁয়াজ কেন ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দৈনিক আল ইহসান শরীফের অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু পেঁয়াজই নয় বরংচ সারাবছর উৎপাদিত প্রায় ফসলেরই ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত থাকছে কৃষক। আর এর মুখ্য কারণই হচ্ছে সংরক্ষনের অভাব। দেখা যায়, দেশের প্রতিটি ফসলেরই বাম্পার ফলন হয় চলতি মৌসুমে। আর এর ফলে বাজারেও এর সরবরাহ বেড়ে যায়। ফলে সিন্ডিকেট মহল সুযোগ বুঝে বাজারে দরপতন ঘটায়। ফলে পানির দামও মেলেনা ফসলের। কৃষক অনেক সময় দাম না পেয়ে উক্ত ফসল জ্বালিয়ে কিংবা পঁচিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়। এমতাবস্তায় যদি হিমাগার থাকে তাহলে সেইসকল উদ্বৃত্ত ফসল সংরক্ষন করে পরবর্তীতে বাজারে সরবরাহ করা যায় এবং কৃষকও ন্যায্যমূল্য পায়। কিন্তু তার কিছুই হচ্ছেনা।

অন্যদিকে, কৃষি নিয়ে দেশে সুদুরপ্রসারি পরিকল্পনার অভাব, অঞ্চলভিত্তিক ফসল সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকা ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবই মূল দায়ী। যার ফলে ভুক্তভোগী কৃষকসহ সাধারণ মানুষ। শুধু পেঁয়াজই নয় উৎপাদন মৌসুমে এই ৩ কারণেই সব কৃষি পণ্য পানির দরে বিক্রি হলেও বছর ধরেই সেসকল পণ্য আমদানি করে বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে।

কৃষকরা জানিয়েছে, পদ্মা আড়িয়ালখা অসংখ্য নদ-নদী খাল বিল সমৃদ্ধ মাদারীপুরের শিবচরের কৃষি জমিতে প্রতি বর্ষায় পর্যাপ্ত পলি পড়ে। ফলে প্রতিবছরই বাম্পার ও সুস্বাদু পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তাই এ অঞ্চলের পেয়াজের কদর দেশজুড়েই সমাদৃত। কিন্তু উৎপাদন মৌসুমে সংরক্ষণের অভাবে কৃষক পেঁয়াজ পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। গত বছর মাদারীপুর জেলায় প্রায় ৪১শ’ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়ে ৯০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তার মধ্যে শুধুমাত্র শিবচর উপজেলাতেই পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩৪শ’ হেক্টর জমিতে। কিন্তু পচনশীল এ পন্য শুধুমাত্র সংরক্ষণের অভাবে পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় এ অঞ্চলের কৃষক।

গত বছর উৎপাদন মৌসুমে খুচরা বাজারে পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হয় ১২-১৫ টাকায়। মণপ্রতি বিক্রি হয় ৫ থেকে ৬শ’ টাকায়। পাইকারি বাজার হয়ে কৃষকের হাতে তা পৌঁছায় আরও কম দামে। অথচ বীজ, সার, শ্রমিকদের টাকা দিয়ে পেঁয়াজ চাষে মণ প্রতি কৃষকের খরচ হয় ৭শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা। তাই গত বছর অনেক কৃষককে মাঠেই পেঁয়াজ রেখে দিতে দেখা গেছে। চলতি বছর পেয়াজের উচ্চমূল্য চলায় কৃষক বিপুল উৎসাহে আবাদ শুরু করেছেন। উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছর কৃষক গত বছরেরও দ্বিগুণেরও বেশি জমিতে আবাদ শুরু করেছেন। কৃষি বিভাগ সারা জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমিতে। তার মধ্যে শিবচরেই এ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে।

কিন্তু উৎসাহের মাঝেও হাসির কোন চিহ্ন মিলছে না কৃষকের মুখে। বীজ ও সারের বাড়তি দাম তাদের শুধু ভাবনার কারণ নয় এরসঙ্গে রয়েছে উৎপাদন পরবর্তী সংরক্ষণাগার বা উপযোগী কোল্ড স্টোর না থাকার মহাচিন্তা। শুধু দুচিন্তার ভাজ এখানেই থেমে নেই একই সময় বহিঃবিশ^ থেকে আমদানি বন্ধ না হওয়া, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব ও বাজার ব্যবস্থাপনার অভাবসহ নানান সংকটে চিন্তার ভাজ কৃষকের কপালে। কৃষি ও কৃষককে বাঁচাতে অঞ্চল ভিত্তিক যে ফসল বা সবজি যে এলাকায় ভালো হয় সংরক্ষণের জন্য সে এলাকায় কৃষি সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণের দাবি কৃষক ক্রেতা বিক্রেতা সবার।

কৃষক বাবু খান বলেন, গত বছর পেঁয়াজ আবাদ করতে সার, বীজ, শ্রমিক খরচসহ প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়। এ পেঁয়াজটি যদি সংরক্ষণ করা যেত তাহলে কৃষকরা চাষাবাদের প্রতি আরও আগ্রহী হতো। মাদারীপুর কৃষি অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ জিএম এ গফুর বলেন, মাদারীপুর, শরিয়তপুরসহ বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল পেঁয়াজ উৎপাদনে সমৃদ্ধ। কিন্তু উৎপাদন মৌসুমে পেয়াজের দাম খুবই কম থাকায় কৃষকরা অনেক লোকসানে পড়েন। সারা বছরই পেঁয়াজ আমাদের প্রয়োজন। এমতাবস্থায় এই এলাকায় যদি আঞ্চলিক একটি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হয় তাহলে সারা বছর কৃষকরা পেঁয়াজ বিক্রি করে লাভবান হতে পারবে আর ক্রেতারাও সহনীয় মূল্যে পেঁয়াজ খেতে পারবে।

Facebook Comments