ইয়াওমুস সাবত (শনিবার), ১৯ অক্টোবর ২০১৯

ভারতের জন্য বাংলাদেশের সব পথই পরিষ্কার হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে নৌ, রেল, সড়ক সব পথেই ভারতের ভৌত যোগাযোগ পরিষ্কার। আকাশ পথেও যোগাযোগ সম্প্রসারণের প্রস্তাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের ভূমিতে বিমানবন্দর নির্মাণসহ দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শহরগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিমান চলাচলের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ফলে এটা কি ধরনের ‘আঞ্চলিক’ কানেকটিটিভিটি সেই প্রশ্ন উঠেছে।

নেপাল এখনও আটকে আছে ভারতের ‘চিকেন নেকে’ এবং বাংলাদেশগামী ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাক আটকানো হচ্ছে আসামে। ফলে যা ঘটছে তা ভারতের সঙ্গে এবং ভারতের জন্যে।

সাউথ এশিয়ান সাব-রিজিওনাল ইকোনোমিক কোঅপারেশন রোড কানেকটিভিটি, ফেইজ-১, ফেইজ-২ শীর্ষক দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার। ওই একই প্রকল্পের ফেইজ-৩ এবং ফেইজ-৪ এর খসড়া প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ফেইজ-১ এর আওতায় গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। ফেইজ-২ এর আওতায় ছয় লেনে উন্নীত হচ্ছে এলেঙ্গা থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল-বগুড়া হয়ে রংপুরের মডার্ন মোড় পর্যন্ত ১৯০.৪ কিলোমিটার সড়ক।

ফেইজ-৩ এর আওতায় রংপুরের মডার্ন মোড় থেকে লালমনিরহাটের বুড়িমাড়ি স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করা হবে। যেটির সংযোগ ঘটবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চেংড়াবান্ধায়।

আর ফেইজ-৪ এর আওতায় ছয় লেনে উন্নীত হবে মডার্ন মোড় থেকে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থল বন্দর সড়কটি। এটির সংযোগ ঘটবে ভারতের জলপাইগুড়ির ফুলবাড়ি সীমান্তে।

এছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি রুটে নতুন নতুন স্থল বন্দর নির্মাণসহ সড়ক সংস্কারের কাজ চলছে যৌথ অর্র্থায়নে। তবে অর্থায়নে ভারতই এগিয়ে।

নৌপথে সংযোগ:

ভারতের সঙ্গে সর্বশেষ স্বাক্ষরিত প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (নৌ প্রটোকল) চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশের মধ্যে তিনটি রুট রয়েছে।

এর মধ্যে কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-ভৈরব বাজার-আশুগঞ্জ-আজমীরিগঞ্জ-মারকুলি-শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ-জকিগঞ্জ-করিমগঞ্জ রুটের কানাই কুশিয়ারা নদীর অংশ বিশেষ করে আশুগঞ্জ থেকে জকিগঞ্জ পর্যন্ত ২৯৫ কিলোমিটার অচল রুটকে সচল করতে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

এছাড়া কলকাতা-হলদিয়া-রায়মঙ্গল-চালনা-খুলনা-মোংলা-কাউখালী-বরিশাল-হিজলা-চাঁদপুর-নারায়ণগঞ্জ-আরিচা-সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারি-ধুবড়া-পান্ডু রুটের যমুনা নদীর অংশ বিশেষ করে সিরাজগঞ্জ থেকে ধুবড়ি পর্যন্ত ১৭৮ কিলোমিটার খননের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

এছাড়া ধুলিয়ান-গোদাগারী-রাজশাহী রুটের পদ্মা নদীর বিশেষ করে ধুলিয়ান থেকে গোদাগারী পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার এবং গোদাগারী থেকে রাজশাহী পর্যন্ত ৯৮ কিলোমিটার খননেরও প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে।

এছাড়া ত্রিপুরা ও বাংলাদেশের মধ্যে থাকা গোমতী ও হাড়োয়া নদীর খননের জন্যও সুপারিশ করেছে যৌথ কারিগরি কমিটি। গত বছরের অক্টোবরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারতের নৌ সচিব পর্যায়ের দুই দিনব্যাপী বৈঠকে ধুলিয়ান-গোদাগারী-রাজশাহী রুট এবং গোমতী ও হাড়োয়া নদীকে ব্যবহারযোগ্য করা যায় কিনা, তা খতিয়ে দেখতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ওই যৌথ কারিগরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

ওই বৈঠকেই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাত্রী ও পর্যটকবাহী ক্রুজশিপ চলাচলের সুযোগ এবং দুই দেশের মধ্যে নতুন নৌবন্দর ‘পোর্ট অব কল’ ঘোষণা সংক্রান্তসহ বেশ কয়েকটি চুক্তি সই করে ঢাকা ও নয়া দিল্লি। বিশেষ করে ভারতের ধুবড়ি এবং বাংলাদেশের পানগাঁও-কে নতুন বন্দর হিসাবে ব্যবহারে চুক্তি হয়।

এছাড়া ভারতের রূপনারায়ণ নদীর গেঁওখালী থেকে কোলাঘাট পর্যন্ত প্রটোকল রুটে অন্তর্ভুক্ত করতে এবং পশ্চিমবঙ্গের কোলাঘাট ও বাংলাদেশের চিলমারীকে নতুন পোর্ট অব কল ঘোষণা করতে দুই দেশ সম্মত হয়।

ওই একই বৈঠকে আসামের বরাক নদীতে করিমগঞ্জের পাশাপাশি বদরপুরে এবং বাংলাদেশের আশুগঞ্জের পাশে ঘোড়াশালে বন্দর তৈরীর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বর্তমানে দুই দেশের ঘোষণা দেয়া পোর্ট অব কলের সংখ্যা ১২টি। এর মধ্যে বাংলাদেশর ৬টি হলো নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, মোংলা, সিরাজগঞ্জ, আশুগঞ্জ এবং পানগাঁও। আর ভারতের ৬টি হলো কলকাতা, হলদিয়া, করিমগঞ্জ, পান্ডু, শীলঘাট এবং ধুবড়ি।

রেলপথে ট্রানজিট:

দুই দেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য পরিবহন চুক্তির আওতায় দীর্ঘ দিন ধরেই পণ্য আমদানি-রফতানি হচ্ছে। তবে এবার বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে রেলপথে ট্রানজিট চায় ভারত।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেলপথে ৮টি ইন্টারচেঞ্জ আছে। যেগুলো হলো বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিংগাবাদ, বিরল-রাধিকাপুর, কুলাউড়া-মহিষাসন, চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ। এর মধ্যে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিংগাবাদ রুটে আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে। বিরল-রাধিকাপুর ব্রড গেজে রূপান্তরের পর ট্রেন চলাচলের উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

বাকি চারটি রুটের মধ্যে কুলাউড়া-মহিষাসনের সংস্কার কাজও শুরু করা হয়েছে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ি পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা ও মোগলহাট-গিতলদহ আপাতত চালুর কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে আখাউড়া-আগরতলা নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর লক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে। এছাড়া ফেনী-বেলুনিয়া রুটেও নতুন ইন্টারচেঞ্জ চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে।

মৈত্রী, বন্ধন ও সৌহার্দ সার্ভিস:

১৯৯৯ সালে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে শুরু হয় সরাসরি বাস সার্ভিস ‘সৌহার্দ্য’। বাংলাদেশের বিআরটিসি ও ভারতের ডব্লিউ বিটিসির কর্তৃপক্ষ উভয় দেশের মধ্যে এই বাস সার্ভিস চালু করে। পরে ২০১৫ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকা-শিলং-গৌহাটি-ঢাকা ও কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা রুটের বাস সার্ভিস। ২০১৭ সালে চালু হয় ঢাকা-খুলনা-কলকাতা-ঢাকা রুটে বাস সার্ভিস।

এছাড়া ২০০৮ সালে ঢাকা-কলকাতার মধ্যে শুরু হয় যাত্রীবাহী ট্রেন সার্ভিস ‘মৈত্রী এক্সপ্রেস’। এর পরে ২০১৭ সালে এর সঙ্গে যুক্ত হয় খুলনা-কলকাতা রুটের ট্রেন সার্ভিস। যার নাম দেয়া হয় ‘বন্ধন এক্সপ্রেস’। সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ পরীক্ষামূলক চালু হয়েছে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা নৌরুটে যাত্রীবাহী জাহাজ সার্ভিস।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে দেশ দুটির মধ্যে ১৯৬৫ সাল পূর্ব রেল লাইনগুলো চালুর কথা।

গত ১৮ জুন দিল্লি ঘুরে এসে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব জানায়, পানিপথে বাংলাদেশ-ত্রিপুরার বাণিজ্য যোগাযোগের কথা। আর এবার অক্টোবরে দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাত করে আগরতলা থেকে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট চলাচলের প্রস্তাব দেন। এছাড়া আগরতলা বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করতে বাংলাদেশের জমি ব্যবহার করতে চায় ভারত।

তবে এসব কানেকটিভিটিতে ভারতের নিশ্চিত লাভ হলেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোন সুফল পাচ্ছে না।

Facebook Comments