ইয়াওমুল আহাদ (রবিবার), ২০ অক্টোবর ২০১৯

কাশ্মীরের পর অস্থিরতা ছড়িয়ে পর্বতময় অঞ্চল লাদাখে

কাশ্মীরের পর অস্থিরতা ছড়িয়ে পর্বতময় অঞ্চল লাদাখে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারত সরকার হিমালয়ের বিরোধপূর্ণ রাজ্য কাশ্মীরে মর্যাদা পরিবর্তন করার প্রায় দুই মাস পর অঞ্চলটির চীন সীমান্তে প্রত্যন্ত ও মনোরম এলাকা লাদাখে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা বাতিল করার পাশাপাশি একে দুটি অংশে বিভক্ত করে কেন্দ্রশাসিত এলাকায় পরিণত করে নয়া দিল্লি। এর একটি হয় জম্মু ও কাশ্মীর, অপরটি হয় লাদাখ।

ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যটিকে নিজের বলে দাবি করে আসছে। উভয় দেশই এর কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজ্যের মর্যাদা বাতিল ও একে দুটি অংশে বিভক্ত করার সময় থেকে ভারত নতুন করে বিপুলসংখ্যক সৈন্য সেখানে মোতায়েন করেছে। এছাড়া নিরাপত্তা দমন অভিযান ও অবরোধ আরোপ করা হয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় কাশ্মীরের লাদাখে অনেক বছর ধরেই উত্তেজনা রয়েছে। লাদাখ আবার প্রশাসনিক দুই অংশে বিভক্ত। একটি হলো লেহ জেলা। এটি বৌদ্ধ প্রাধান্যবিশিষ্ট। আর কারগিল জেলার বেশির ভাগ লোক মুসলিম। এখানে মাঝে মাঝেই ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত সঙ্ঘাত হয়।

আগামী ৩১ অক্টোবর নয়া দিল্লি আনুষ্ঠানিকভাবে লাদাখের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। এই এলাকাটির জনসংখ্যা খুবই কম হলেও মনোরম ভূ-প্রকৃতি, পর্বতশীর্ষের মঠগুলোর বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, তুষার লিওপার্ডের জন্য বিখ্যাত।

তবে কেন্দ্রীয় শাসনে ভবিষ্যত কেমন হবে তা নিয়ে বৌদ্ধ ও মুসলিম উভয়ই শঙ্কিত হয়ে পড়ছে। অবশ্য এখন পর্যন্ত সঙ্ঘাতহীন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিয়েই উত্তেজনা রয়েছে।

সরকার যখন এলাকাটির মর্যাদা পরিবর্তন করেছিল, তখন লাদাখে উৎফুল্লতা দেখা গিয়েছিল। দশকের পর দশক ধরে বৌদ্ধ নেতারা মুসলিম শাসনের অধীনে তাদের সমস্যাগুলোর কথা বলে আসছিল। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে কাশ্মীরে বিদ্রোহ দেখা গেলে তাদের অভিযোগ বাড়তে থাকে। কিন্তু ভারত সরকারের নতুন পদক্ষেপের ফলে তাদের মধ্যে ভূমি দখল, ব্যবসা বাণিজ্য খোয়ানো, নাজুক প্রতিবেশ ধ্বংস হওয়ার মতো আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

লেহ শহরের বৌদ্ধ নেতারা জনসংখ্যার পরিবর্তন নিয়েও শঙ্কিত। তারা আশঙ্কা করছেন, ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে হিন্দুরা এসে তাদের এলাকায় বসতি স্থাপন করবে।

লাদাখ বৌদ্ধ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সনম দাওয়া বলেছে, কাশ্মীর থেকে আলাদা করার পর আমরা খুশি হয়েছিলাম, সত্য। কিন্তু আমরা এখন বুঝতে পারছি, ভালো কিছুর সাথে খারাপও আসবে।

সে জোর দিয়ে বলেছে, তারা বাইরের কারো কাছে এক ইঞ্চি জমিও বিক্রি করবে না।

সে জানিয়েছে, আমাদের জমি, আমাদের জনগণ ও ব্যবসার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাই আমরা। আমরা মনে করি, এসব ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইস্যুতেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। গত বছর ৩,৭০,০০০ বিদেশী ও ভারতীয় পর্যটক লেহ সফর করেছে। চলতি বছরের আগস্টের মধ্যে ২,০০,০০০ পর্যটক সফর করেছে।

অল লাদাখ ট্যুর অপারেটর্স এসোসিয়েশনের প্রধান সেতান আঙচুক বলেছে, তারা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত।

সে জানায়, এখন পর্যন্ত পর্যটক আগমন ৪৫ ভাগ কমেছে। আমরা পর্যটন খাতে সরাসরি বহিরাগতদের চাই না। আমরা চাই, আমরাই চালাব আমাদের ব্যবসা।

এই অঞ্চলেই রয়েছে বিশ্বের উচ্চতম যুদ্ধক্ষেত্র। ৬,৭০০ মিটার উচ্চতায় সিয়াচেন হিমবাহে ভারত ও পাকিস্তান তাদের সৈন্যবাহিনী মোতায়েন করে রেখেছে। যুদ্ধের চেয়ে কঠোর আবহাওয়াতেই বেশি সৈন্য মারা যায়।

ভারত-চীন সীমান্ত নিয়েও বিরোধ রয়েছে। বেইজিং সেখানকার আকসাই চিন নিয়ন্ত্রণ করে। উভয় দেশ লাদাখ নিয়েও ১৯৬২ সালে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।

গত মাসেও দুই দেশের মধ্যে সামান্য সঙ্ঘাত হয়েছিল।

হিমালয়ান ইনস্টিটিউট অব আলটারনেটিভস পরিচালনাকারী প্রকৌশলী সনম ওয়াংচুক আশাবাদ প্রকাশ করে বলে, লাদাখ হতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের মডেল।

সে বলে, আমরা আমাদের মানুষ, আমাদের ভূমি ও আমাদের প্রতিবেশের সুরক্ষা চাই। আমরা বহিরাগতদের কাছ থেকে সুরক্ষা চাই।

সে বলে, আমরা নিজ ভূমিতে পরবাসী হতে চাই না।

লাদাখে কেন্দ্রীয় শাসন নিয়ে লাদাখের কারগিল জেলায় অসন্তোষ রয়েছে। এখানকার মুসলিমেরা কাশ্মীর উপত্যকার সাথে সংযুক্ত থাকতে চায়। বিপুল সামরিক উপস্থিতির মধ্যেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করছে।

কারগিলের জেলা প্রশাসক বসির উল হক চৌধুরী বলেন, বিক্ষোভ দমনে কোনো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে না। কর্তৃপক্ষ তাদের বুঝিয়ে কাজে ফিরিয়ে নিতে চাচ্ছে।

কারগিলের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতা আসগর আলী কারবালাই বলেন, এখানকার লোকজনের সাথে কাশ্মীর উপত্যকার নিরবিচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। এখানকার অনেকেই কাশ্মীরী বিদ্রোহে সমর্থন দিয়েছে।

অনেক মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনায় স্বাধীনতা দাবি করে পোস্টার লাগানো রয়েছে।

এদিকে জাকির হোসেনের মতো কৃষকেরা অভিযোগ করছেন, কাশ্মীর উপত্যকা অচল থাকায় তাদের আখরোট বাগানেই নষ্ট হচ্ছে।

সে বলেন, আমাদের বাজার কাশ্মীর, লেহ নয়।

Facebook Comments