ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার), ২৩ অক্টোবর ২০১৯

ব্যাংক ঋণে ঝুঁকছে সরকার

ব্যাংক ঋণে ঝুঁকছে সরকার

নিউজ ডেস্ক : বাজেট বাস্তবায়নে অর্থ সংকটে সরকার। সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে ধীরগতির কারণে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিতে হচ্ছে সরকারকে। চলতি অর্থবছরের দেড় মাসেই বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকের বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার। এ কয়েক দিনের নেওয়া ঋণ গত অর্থবছরের পুরো সময়কে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। বড় ধরনের ঋণ (বিনিয়োগ) দিতে পারছে না ব্যাংকগুলো। এতে করে বেকারত্বের হার বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের দেড় মাসে (১ জুলাই থেকে ১৫ অগাস্ট) ব্যাংক থেকে ২৩ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার । অর্থবছরের পুরো সময়ে (১২ মাসে, ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা আছে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ২৬ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। এ হার ঋণ নেয়া অব্যাহত থাকলে সরকারকে এখাত থেকে ঋণ নিতে হবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে। যা ব্যাংকিং খাত বড় ধরনের ঝুকিতে পরতে পারে।

এ বিষয়ে অর্থনীতির গবেষক জায়েদ বখত জানায়, রাজস্ব আদায় কম । কড়াকড়ি এবং কর বাড়ানোর ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রিও অনেক কমে গেছে। তাই খরচ মেটাতে সরকারকে বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। রাজস্ব আদায় না বাড়লে ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। সেক্ষেত্রে বেসরকারি খাত ঋণ কম পাবে। বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ বড় বড় প্রকল্পে সরকারের খরচ বাড়ায় ঋণ নির্ভরতা বেড়েছে বলে মনে করেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক সরবরাহ করেছে ৬ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ১৭ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
সরকার ট্রেজারি বিল ও বন্ডের বিপরীতে ৯১ দিন থেকে শুরু করে ২০ বছর পর্যন্ত মেয়াদে ঋণ নেয়। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩১ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা।

এরমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার নিয়েছে ৯১ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক দিয়েছে ৪০ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা।

গত অর্থবছর থেকে সরকারের ঋণ বাড়লেও সা¤প্রতিক কয়েক বছর ব্যাংক থেকে সরকার তেমন ঋণ নিচ্ছিল না। কোনো-কোনো অর্থবছর সরকার ব্যাংক থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল, পরিশোধ করেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি।

চলতি অর্থবছর তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ছিল ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। আশানুরূপ আদায় না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে তা ২ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়, যদিও শেষ পর্যন্ত আদায় হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেও রাজস্ব আদায়ের গতি ভালো না। আড়াই মাস হতে চললেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব আদায়ের এক মাসের তথ্যও প্রকাশ করেনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবি আরের এক কর্মকর্তা বলেন, অর্থবছরের প্রথম মাসের (জুলাই) রাজস্ব আদায়ের তথ্য পাওয়া গেছে। তাতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হলেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম আদায় হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২ হাজার ১৬০ কোটি ১৭ লাখ টাকার নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অংক গত বছরের জুলাই মাসের চেয়ে অর্ধেকেরও কম। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৩৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বিক্রির চাপ কমাতে চলতি বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার উপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একইসঙ্গে সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শণাক্তকরণ নম্বর) এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বাধ্যতামূলকসহ আরও কিছু নতুন শর্তের কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে বলে মনে করছেন বি আইডিএসের গবেষক জায়েদ বখত।

আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। বিনিময়ে সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের প্রতি মাসে সুদ দিতে হয়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ’ বা ‘ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।

মুনাফার উপর করের হার বৃদ্ধির কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম হবে ধরে নিয়ে এবারের বাজেটে এ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য কম ধরেছে সরকার।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্য ধরা আছে ২৭ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাত থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে করা হয় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্রে ঋণের পরিমাণ গিয়ে দাঁড়ায় ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা।

২০১৭-১৮ অর্থবছর ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সরকার নিয়েছিল মাত্র ৯২৬ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছর সরকার যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছিল পরিশোধ করেছিল তার চেয়ে ১৮ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি।

তার আগের অর্থবছর নিয়েছিল মাত্র ৪ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছর সরকারের ঋণ কমেছিল ৬ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা।

জানা গেছে,এ বছর শুরু থেকে বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম হওয়ায় সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে করে চাপে রয়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। একই সাথে বিনিয়োগও কমেছে। সরকারের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নে অর্থ সংকটে পড়েছে। বাধ্য হযে বেশি সুদে হলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার। এতে করে জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা আরও বাড়ছে। এ নিয়ে সরকারকে এক্ষণি চিন্তা করতে হবে।

Facebook Comments