ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ২২ আগস্ট ২০১৯

কুরবানিতে আরও শক্তিশালী হয় অর্থনীতি

কুরবানিতে আরও শক্তিশালী হয় অর্থনীতি

প্রতি বছর কুরবানি ঘিরে লাখো কোটি টাকা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়। শক্তিশালী হয় দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো। পাশাপাশি আভ্যন্তরীন অর্থনৈতিক লেনদেনে দেশের জাতীয় অর্থনীতিও চাঙ্গা হয়। কুরবানিকেন্দ্রীক ঠিক কত লাখ কোটি টাকার বাণিজ্য হয় তার সঠিক হিসেব নেই। কারণ প্রতিবছরই এই অর্থনীতির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। কয়েকটি খাত পর্যালোচনা করলে এর ব্যাপকতা বেরিয়ে আসে

মুদ্রা সরবরাহ: পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষ্যে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক মুদ্রা সরবরাহ হয়ে থাকে। বিশেষ করে পবিত্র কুরবানির পশু ক্রয়ে বিশাল অংকের অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে। বাংলাদেশ মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার মতো। এরপরই রয়েছে দেশের মসলা বাজার। চামড়া শিল্পেও এ সময় বিশাল অর্থের ঋণ দিয়ে থাকে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংক। সেইসাথে হজ্বকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ বিমানসহ অনান্য বেসরকারি সংস্থাগুলো দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অংকের টাকা যোগ করে থাকে। এছাড়া দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী বা শ্রমিকরাও ঈদ উপলক্ষ্যে এ সময়ে রেমিটেন্স খাতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ যোগান দেয়। রেমিটেন্স ‘ফ্লো’ দুই ঈদেই সর্বোচ্চ থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ঈদুল ফিতরের সময়ে অর্থাৎ গত মে মাসে ১৭৫ কোটি ৫৮ লাখ ডলার বা ১৪ হাজার ৭৪৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা রেমিটেন্স এসেছে বাংলাদেশে (১ ডলার সামা ৮৪ টাকা হিসাবে)। কুরবানির ঈদেও ১৫ হাজার কোটি টাকার আশে পাশেই রেমিটেন্স আসবে বলে ধারণা তাদের। আর কুরবানি উপলক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহনে সাধারণ সময়ের চেয়ে অনেক বেশি টাকা আয় হয়।

আভ্যন্তরিণ পরিবহন বাণিজ্য: ঈদ মানেই নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা। বিশেষ করে পবিত্র কুরবানির ঈদে মানুষের সংখ্যাটা অনেক বৃদ্ধি পায়। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পরিবহন খাতে ঈদকে কেন্দ্র করে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যবসা বা লেনদেন হয়ে থাকে। এটিও অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে।

চামড়া খাত: চামড়া খাতে কুরবানির ঈদ কেন্দ্রিক লেনদেনের অর্থ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়ীদের হিসাবে চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ও ব্যবসা জড়িত। যা কুরবানির ঈদকে কেন্দ্র করেই পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো প্রতিবছর তাই এ সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিশেষ ঋণ দিয়ে থাকে, বেসরকারি ব্যাংকগুলো দেয় ৮০-১০০ কোটি টাকা।

নিত্য-পণ্যের বাণিজ্য: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র কুরবানির ঈদে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় আড়াই লাখ টন। প্রতিলিটার ভোজ্যতেলের গড় দর ১০০ টাকা হিসাবে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। দুই লাখ টন পেঁয়াজে থেকে ৪০ টাকা গড়ে প্রায় ৮০০ কোটি ও রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ বিক্রির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া গরম মসলা এলাচি, দারুচনি, লবঙ্গ, জিরাসহ অন্যান্য মসলা বিক্রি হয়ে থাকে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য।

কুরবানির পশুর উচ্ছিষ্ট থেকে আয় হাজার কোটি টাকা: পবিত্র কুরবানির পশুর গোশত আর চামড়ার কদর সবারই জানা। কিন্তু গোশত আর চামড়ার পাশাপাশি কুরবানির পশুর হাড়, শিং, অন্ডকোষ, ভুঁড়ি, মুত্রথলি, পিত্তথলি, পাকস্থলি, রক্ত ও চর্বি কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পশুর এসব উচ্ছিষ্ট অঙ্গ ওষুধ শিল্পসহ অন্যান্য শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল এবং রফতানিয্যো হওয়ায় এর বাণিজ্য দাড়িয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকায়।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পশুর বর্জ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছর এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। বেসরকারি হিসেবে এর পরিমাণ প্রায় হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। কুরবানীর ঈদে শুধু ঢাকা শহরেই উৎপাদিত হয় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন বর্জ্য। কুরবানীর বর্জ্য হলো হাড়, শিং, নাড়িভুঁড়ি, পিত্তথলি, মূত্রথলি, রক্ত, চর্বি এবং চামড়ার ওয়েস্টেজ অংশ। এগুলো রফতানী করলে হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব শুধু কুরবানী ঈদকে কেন্দ্র করে।

Facebook Comments