ইয়াওমুল আহাদ (রবিবার), ২৯ মার্চ ২০২০

কুড়িগ্রামে বন্যায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি

কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা : কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি কমতে শুরু করলেও টানা ৯ দিন ধরে পানিবন্দি মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগের মধ্যে। সীমিত আকারে ত্রাণ শুরু হলেও বেশ কয়েক জায়গার মানুষ ত্রাণ পায়নি বলে জানিয়েছে। ফলে বানভাসি মানুষ রয়েছে খাদ্য সংকটে।

বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে এখন ১২৫ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদীর পানি ১১ সেন্টিমিটার কমে গিয়ে ১০৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

এর আগে বুধবার রাতে চিলমারী উপজেলার কাচকল এলাকায় বাঁধ ভেঙে গোটা উপজেলাবাসী পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায়। তিন উপজেলায় সব ধরনের কার্যক্রম স্তবির হয়ে পড়েছে।

কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে উপজেলা প্রশাসন, থানা, হাসপাতালসহ গোটা এলাকা। এখন পর্যন্ত বন্যায় ৫৬টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি গ্রাম পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এতে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দী রয়েছে।

এদিকে উলিপুরের ধামশ্রেণি ইউনিয়নের মধ্য নাওড়া গ্রামে বাবলু মিয়ার কন্যা ববিতা খাতুন (১৬) পানি ভেঙে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে ডোবা রাস্তা ধরে বাড়িতে আসার পথে খালে পড়ে মারা যায়। এনিয়ে গত নয় দিনে জেলায় পানিতে ডুবে মারা গেল ১৪ জন। এরমধ্যে উলিপুরেই মারা গেছে ৮ জন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ও পাঁচগাছী ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বানভাসিদের দুর্ভোগ। পাঁচগাছী ইউনিয়নের গারুহারা এলাকার টাবুর গ্রাম পুরো তলিয়ে গেছে। এখানে বাণিয়াপাড়াসহ দেড়শ পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে।

গ্রামের একটি উঁচু ভাসমান ব্রিজে ৪দিন ধরে ৪টি পরিবার অবস্থান করছে। দুপুরে এই পরিবারের ছয় বছরের পুত্র বাবু লবণ দিয়ে ভাত খাচ্ছিল। তরকারির জন্য কান্নাকাটি করছিল সে। খেতেই চাইছিল না।

সেখানে অবস্থান নেয়া হোসেন আলী, হাছেন আলী, আফসার ও মোয়াজ্জেম জানান, চারদিন ধরি পড়ি আছি। কাঁইয়ো হামারগুলার খবর নেয় না। কোনো ত্রাণ পাননি বলে তারা অভিযোগ করেন।

পার্শ্ববর্তী যাত্রাপুর ইউনিয়নের আরাজী ভোগডাঙ্গা চরের কোরবান আলী একই অভিযোগ করে বলেন, হামাকগুলাক কাঁইয়ো রিলিফ দেয় নাই। বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ায় কোরবান আলীর বাড়িতে ছয়দিন ধরে আশ্রয় নিয়েছেন জরিনা, তার স্বামী জমদ্দি, শ্বশুর খয়বর ও ২ সন্তান

গত ৪ দিন ধরে তারা নৌকায় অবস্থান করছেন। ঘরের ভেতর গলা পানি। রাত্রিযাপন করার মতো অবস্থা নেই। চুলা ভিজে যাওয়ায় বিকাল ৩টা পর্যন্ত রান্না হয়নি।

জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, বন্যার ফলে ৫৬টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি গ্রাম পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এতে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৩শ’ পরিবারের সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৯ ঘরবাড়ি। ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আরও প্রায় ৫ হাজার মানুষ।

বন্যায় ৩২ কিলোমিটার বাঁধ, ৭২ কিলোমিটার কাচা ও ১৬ কিলোমিটার পাকা রাস্তা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। বন্যায় ৭৫৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক এবং ৪টি ভাঙনে বিলিন হয়ে গেছে। বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে ১৫ হাজার ১৬০ হেক্টর। জেলার ২১টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৩৫ হাজার ৬৪৪জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

জেলা প্রশাসন থেকে এখন পর্যন্ত ৫ মেট্রিক টন জিআর চাল, ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ৩ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৬ হাজার ৪২৮ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. হাফিজুর রহমান বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করে বলেন, বন্যার্ত সব পরিবারে সহায়তা দেয়া হবে। কেউ যাতে বাদ না যায়- তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Facebook Comments