ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ১৪ নভেম্বর ২০১৯

খেলাপি ঋণ বাড়ার নেপথ্যে কারা?

নিউজ ডেস্ক:ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ার নেপথ্য নায়কদের অনুসন্ধানে নেমেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রাথমিকভাবে তিন ব্যাংকের শীর্ষ ৬০ গ্রাহকের ওপর বিশেষ তদন্ত করতে যাচ্ছে। এজন্য ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মহাব্যবস্থাপককে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া, ব্যাংক তিনটিতে বিশেষ পরিদর্শন চালাতে তিনটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিগুলোকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, তদন্তের জন্য প্রাথমিকভাবে সরকারি ব্যাংকের মধ্যে জনতা ব্যাংক, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে এ বি ব্যাংক ও ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে বেছে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত কমিটি। প্রতিটি ব্যাংকের পাঁচ জন শীর্ষ ঋণখেলাপি, পাঁচ জন শীর্ষ খেলাপি ঋণ নবায়নকারী, পাঁচ জন শীর্ষ সুদ মওকুফকারী ও পাঁচ জন শীর্ষ খেলাপি ঋণ অবলোপনকারী গ্রাহকের ওপর এ তদন্ত হবে। তদন্ত কমিটি খেলাপি ঋণ কমাতে ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘শুধু অনিয়মের কারণেই নয়, কিছু ঋণগ্রহণকারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি তৈরি করছে। অনিয়মকারীদের সঙ্গে কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজস এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের কারণে পুরো অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।’ সোমবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে ১৮তম নুরুল মতিন মেমোরিয়াল লেকচার ‘ইথিকস ইন ব্যাংকিং’ অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

প্রসঙ্গত, ব্যাংকিং খাতকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে নানামুখী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামালকে প্রধান করে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটিসহ মোট ৭টি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনের কারিগরদের খুঁজতে তিনটি কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা ব্যাংক তিনটির ঋণের বিষয়ে ব্যাংকের সম্পদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির (এলকো) মতামত যাচাই করবেন। এ ছাড়া, কমিটি ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের আবেদন, শাখার মূল্যায়ন, প্রধান কার্যালয়ের মূল্যায়ন, পর্ষদ বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, মঞ্জুরিপত্র, প্রকল্প পরিদর্শন প্রতিবেদন, সহযোগী জামানতের মূল্যায়ন, আইনগত মতামত, ডকুমেন্টেশন, ঋণ বিতরণ ও তদারকির বিষয়াগুলো খতিয়ে দেখবে। শুধু তাই নয়, ওইসব ঋণ বিতরণের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্টের মূল্যায়ন পরবর্তী সময়ে ওই ঋণ মনিটরিংয়ে তাদের কোনও ভূমিকা ছিল কিনা তাও পর্যালোচনা করে দেখা হবে। এ ছাড়া, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট বিভাগ ও আঞ্চলিক অফিস থেকে ওইসব ঋণের বিষয়ে যতগুলো অডিট পরিচালিত হয়েছে সেসব প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে। বহিঃর্নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কোনও নেতিবাচক মতামত রয়েছে কিনা তাও যাচাই করা হবে। একইভাবে বাণিজ্যিক অডিটের আপত্তিগুলো পর্যালোচনা করা এবং পর্ষদকে বিভিন্ন সময়ে ওইসব ঋণের হালনাগাদ অবস্থা অবহিত করা হয়েছে কিনা, এতে পর্ষদের কোনও মতামত ছিল কিনা তা যাচাই করে দেখা হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাংক খাতে মূল সমস্যা সুশাসনের অভাব। এই খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলে খেলাপি কমে আসবে।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘আগে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে। এক্ষেত্রে অনিয়ম, জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা ও গ্রাহকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে হবে।’

জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর শীর্ষ ঋণ গৃহীতার পাশাপাশি পরিচালকদের ঋণের ওপরও তদন্ত হবে। অভিযোগ রয়েছে, পরিচালকেরা নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকেও ঋণ নিচ্ছেন। এভাবে অনেক ব্যাংকের পরিচালকেরা ঋণ ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন। কিন্তু ঋণ নিয়ে পরে আর তা আদায় করছেন না, বরং ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে তা আদায় দেখানো হচ্ছে। আবার কিছু কিছু গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ করছেন না। এতে বেড়ে গেছে ঋণখেলাপির পরিমাণ। এ ছাড়া, ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে কী পরিমাণ বৈদেশিক তহবিল আনা হয়েছে, ওই তহবিল কাদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে, এসব তহবিলের সদ্ব্যবহার হয়েছে কিনা, নাকি পাচার হয়েছে, তদন্তে এসব বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হবে। প্রতিটি ব্যাংকে আলাদা টিম পাঠানো হবে। তাদের নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম।

জনতা ব্যাংক

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনের কারিগরদের খুঁজতে ৪ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার চৌধুরীর নেতৃত্বে এতে সদস্য রয়েছেন ডিজিএম আবদুল লতিফ, যুগ্ম-পরিচালক ইমরুল হায়দার চৌধুরী, উপ-পরিচালক এসএএম মতিউল হক।

এবি ব্যাংক

এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনের কারিগরদের খুঁজতে ডিজিএম একেএম গোলাম মাহমুদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন যুগ্ম-পরিচালক কাজী আরিফুর রহমান, উপ-পরিচালক মাধব কুমার সাহা।

আল-আরাফাহ্ ইসলামী

আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনের কারিগরদের খুঁজতে ডিজিএম রুকুনুজ্জামানকে প্রধান করে ৩ সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন, উপ-পরিচালক মোশাররফ হোসেন ও উপ-পরিচালক নাছির মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

Facebook Comments