ইয়াওমুল ইসনাইন (সোমবার), ১৮ নভেম্বর ২০১৯

চার মাত্রার সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে বেসিক ব্যাংক

নিউজ ডেস্ক : মোট বিতরণকৃত অর্থের অর্ধেকেরও বেশি খেলাপি ঋণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন ঘাটতি এবং পরিণতিতে লোকসান Ñএ চার মাত্রার সঙ্কটে ঘুরপাক খাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক। তবে সার্বিক দুর্গতির জন্য খেলাপি ঋণ-ই প্রধান সমস্যা বলে মনে করছে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। বিদ্যমান অবস্থা থেকে উত্তরণে ব্যাংকটির যে কর্মপরিকল্পনা এতে পরিস্থিতির উন্নতিতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ২০০৯ সাল পর্যন্ত বেসিক ছিল লাভজনক ও সফল একটি ব্যাংক। পরবর্তীতে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত নানা অনিয়মের কারণে বর্তমানে ব্যাংকটির এই করুণ পরিণতি। আলোচ্য সময়ে ‘ঋণ যাচাই কমিটি’র মতামতকে উপেক্ষা করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। এর প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে। ওই সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন আবদুল হাই বাচ্চু ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন কাজী ফখরুল ইসলাম। বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে বর্তমানে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ (দুদক) দায়েরকৃত একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।

বেসিক ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সংঘটিত নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটিতে তখন খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬৭ দশমিক ৯২ শতাংশ। পরবর্তীতে ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে খেলাপি ঋণের হার কমে দাঁড়ায় ৫১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। কিন্তু সর্বশেষ গত ২০১৭-১৮ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটিতে খেলাপি ঋণের হার আবার বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং খেলাপি ঋণের স্থিতির লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে গত ডিসেম্বর (২০১৮) শেষে বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৬১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা এবং ১৪০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৮) ব্যাংকটি আদায় করেছে ৭৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা (৫৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ)। অন্যদিকে অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ খাত থেকে ১০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২০ লাখ টাকা (২ শতাংশ)।

অন্যান্য সূচকের মধ্যে গত ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূলধন ঘাটতি পূরণে বাজেটের ‘মূলধন পুনর্গঠনে বিনিয়োগ’ খাত থেকে গত চার বছরে বেসিক ব্যাংককে মোট ৩ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা দিয়েছে সরকার। যেটি সর্বোচ্চ। তবে সর্বশেষ অর্থবছরে (২০১৭-১৮) কোন অর্থ দেয়া হয়নি। বর্তমানে ব্যাংকটির মূলধন সংরক্ষণের হার ঋণাত্মক। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এই ঋণাত্মক হার ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে ছয় মাসে গত ডিসেম্বর শেষে মূলধন সংরক্ষণের ঋণাত্মক হার দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে প্রভিশন ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪২ শতাংশ; এর বিপরীতে গত ডিসেম্বর শেষে প্রভিশন সংরক্ষণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ০৩ শতাংশ।

বেসিক ব্যাংক পর্ষদের মতে, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার কারণে মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের মুনাফা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যাংকটির নীট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে ব্যাংকটির নীট লোকসানের স্থিতি ২৮৫ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি অর্থবছরে ব্যাংকটির পরিচালনা মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৮) ব্যাংকটি লোকসান দিয়েছে ৮৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।

Facebook Comments