ইয়াওমুল ইসনাইন (সোমবার), ১৮ নভেম্বর ২০১৯

এ বছরই বেসরকারি খাতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন

নিউজ ডেস্ক: উৎপাদনের মতো বিদ্যুৎ সঞ্চালনেরও একটি অংশ বেসরকারি খাতে ছাড়তে চায় সরকার। বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় ২০৪১ সাল মেয়াদে বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ২৫ বিলিয়ন ডলার (দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ এককভাবে না করে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণের চিন্তা থেকে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
গত বছর থেকে আলোচনা জোরালো হলেও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) সূত্র বলছে, এ বছরের মধ্যে দুটি এলাকায় গ্রিড নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা এই প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছেন।
পিজিসিবি সূত্রমতে, প্রাথমিভাবে কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে মদুনাঘাট ও চট্টগ্রামের রাউজান থেকে মীরসরাই পর্যন্ত দুটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। গ্রিড দুটি বেসরকারি গ্রিড হবে। এই গ্রিড দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নির্দিষ্ট হারে ট্যারিফ দিতে হবে। যেভাবে পিডিবি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য পিজিসিবিকে ট্যারিফ দেয়। এই ট্যারিফের একটি অংশ কর হিসেবে সরকারি কোষাগারে যোগ হবে। তবে যেহেতু নীতিমালা চূড়ান্ত হয়নি, তাই ট্যারিফ এবং করের হার এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুম-আলবেরুনী বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে পিজিসিবি দুই জায়গায় সঞ্চালন লাইন করার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন পাওয়ার সেল নীতিমালা তৈরি করছে, বিড ডকুমেন্ট তৈরি করছে। সব কাজ শেষ হলে আগামী জুন নাগাদ চূড়ান্ত হতে পারে।’
পিজিসিবি জানায়, এই সঞ্চালন লাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে আইপিপির কোন মডেল অনুসরণ করা হবে, তা নির্ধারণের জন্য সরকারের বিদ্যুৎ বিষয়ে নীতি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার সেলকে বলা হয়েছে। তারা একটি মডেল চূড়ান্ত করলে ওই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
১৯৯৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার নীতিমালা তৈরি করে। এর ফলে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এখন দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেক বেসরকারি খাত থেকে নেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় গ্রিড লাইন নির্মাণেও বেসরকারি অংশগ্রহণ চাইছে সরকার।
২০৪১ সাল মেয়াদি উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ মহাপরিকল্পায় বলা হচ্ছে, সঞ্চালন ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালে ৪ বিলিয়ন, ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালে আরও ৪ বিলিয়ন এবং শেষ ৬ বছরে ২০৩৬ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান বলছে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ৮২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এই সময়ের মধ্যে প্রতি বছরই একটু একটু করে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে গ্রিডেরও সম্প্রসারণ করতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সঞ্চালন কোম্পানি পিজিসিবির পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহম্মদ হোসেইন বলেন, ‘পিজিসিবি দুটি প্রজেক্ট ঠিক করেছে। পাওয়ার সেলের পক্ষ থেকে বেসরকারি খাতে সঞ্চালন লাইন দিতে একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি দরপত্র আহ্বানের জন্য কাগজপত্র তৈরি করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী দুই মাসের মধ্যে দরপত্র তৈরি করা হবে। সে অনুযায়ী এ বছরের মধ্যেই বেসরকারি খাতে সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য প্রথমবারের মতো দরপত্র আহ্বান করা হবে।’
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, দেশের গ্রিডভুক্ত মোট উৎপাদন ক্ষমতা ১৭ হাজার ৯৬৫ মেগাওয়াট। তবে বয়সের কারণে কোনও কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা কমেছে। এতে করে দেশের প্রকৃত উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৪২২ মেগাওয়াটে। বর্তমানে গড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে ৭ হাজার থেকে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। এর বিপরীতে ২০০৯ সালে যেখানে সঞ্চালন লাইন ছিল মাত্র ৮ হাজার সার্কিট কিলোমিটার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৩-এ।
পিজিসিবি জানায়, বর্তমানে ৪০০ কেভি ক্ষমতার ৬৯৭ সার্কিট কিলোমিটার সঞ্চালন লাইন রয়েছে। ২৩০ কেভি ক্ষমতার লাইন রয়েছে ৩ হাজার ৩৪২ সার্কিট কিলোমিটার এবং ১৩২ কেভির লাইন রয়েছে ৬ হাজার ৯৯৪ সার্কিট কিলোমিটার। এছাড়া সাবস্টেশনের সক্ষমতা ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ হাজার ৪৬-তে।
সঞ্চালন লাইন ও বিতরণ লাইনের পরিধি বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় উন্নতি কম হওয়ার কারণে এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছেই। কোনও কোনও এলাকায় দিনের বেলা ৩ থেকে ৪ বার লোডশেডিং হওয়ারও অভিযোগ আছে। আগে বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর ওপর এই দায় চাপানো হলেও দেশের কোনও কোনও এলাকায় গ্রিড সংকটের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বিরোধী জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম। বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে শুধু নজর দেওয়ার কারণেই বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের আজকের এই অবস্থা। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সরকার ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র বেসরকারি খাতে আনার পরিকল্পনা করে। এতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা না থাকায় বহু বেসরকারি কেন্দ্র বসে আছে। কিন্তু তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। লোকসানে পড়ছে পিডিবি। একই পদ্ধতিতে সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে সেখানে সঞ্চালন চার্জ বেড়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘সঞ্চালন লাইন বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে সেক্ষেত্রে যেন ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা না হয়। যতটুকু বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে সে অনুযায়ী দাম ধরে কোম্পানিকে অতিরিক্ত মুনাফাসহ হুইলিং চার্জ দেওয়া যেতে পারে। তাহলে আর একই রকম লোকসানে পড়বে না বিদ্যুৎ খাত।’
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমত উল্লাহও বেসরকারি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো সঞ্চালন লাইনও বেসরকারি খাতে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিবেশী ভারত বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ নিলেও সঞ্চালন ব্যবস্থা কিন্তু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।’ ফলে সরকারের আরও ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে তিনি মত দেন।

Facebook Comments