ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ১৪ নভেম্বর ২০১৯

লালদীঘি ২৪ হত্যা: আসামির ‘মৃত্যু প্রতিবেদন’ আসেনি ছয় মাসে

নিউজ ডেস্ক:

মামলার দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করার পরও তিন দশক আগে চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠে গুলি চালিয়ে ২৪ জনকে হত্যার বিচার গতি পাচ্ছে না।

সাড়ে ছয় মাস ধরে এ মামলার কার্যক্রম আটকে আছে প্রধান আসামি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার প্রশ্নে।

রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি বলছেন, আগামী ৭ মার্চ এ মামলার শুনানির পরবর্তী তারিখ রয়েছে। সেদিন এর মীমাংসা হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।

অথচ এ মামলার বিচার শেষ না হওয়ায় তিন মাস আগেই এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা; যিনি ৩০ বছর আগের ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।

সেই ঘটনায় নিহতদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করে গত ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী বিচার দ্রুত শেষ করার পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন।

এই মামলার প্রধান আসামি রকিবুল হুদার মৃত্যুর বিষয়টি তার আইনজীবী চট্টগ্রামের বিশেষ জজ আদালতকে জানান গতবছর জুলাই মাসে।

এরপর রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশকে নির্দেশ দেয় আদালত।

পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট না হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ আবারও আবেদন করে। এরপর আদালত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলে।

সেই প্রতিবেদন এখনও আসেনি জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আদালত প্রতিবেদন দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিল। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে জানাতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে। সেখান থেকে কোনো জবাব এখনো আসেনি।”

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের শেষ দিকে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নগরীর লালদীঘি ময়দানে এক জনসভায় যাওয়ার পথে তার গাড়িবহরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে কমপক্ষে ২৪ জন নিহত হন।

২০১৬ সালের ২৬ জুন এ মামলায় আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে’ সেদিন গুলি চালানো হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে তা তার গায়ে লাগেনি। বিনা উসকানিতে সেদিন ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ ঘটানো হয়েছিল।

চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার ও মামলার আসামি মীর্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে ওই ঘটনা ঘটানো হয় বলে আদালতকে বলেন মোশাররফ।

গত বছরের জুলাই মাসে রকিবুল হুদার মৃত্যুর খবর জানিয়ে আসামিপক্ষ যে পিটিশন দিয়েছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা একটি ডেথ সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়েছিল।

এরপর ১৭ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে এ বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ের আবেদন করলে আদালত পুলিশ কমিশনারকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলে।

ওই নির্দেশের প্রেক্ষিতে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের দেয়া প্রতিবেদনে বলা হয়- স্ত্রীর মৃত্যুর পর মীর্জা রকিবুল হুদা ‍যুক্তরাষ্ট্রে সন্তানদের কাছে চলে যান।

“তার চাচাত ভাই ইমন মির্জা জানিয়েছেন- তিনি যুক্তরাষ্ট্রে মারা গেছেন। তবে তিনি মৃত না জীবিত সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।”

এতে সন্তুষ্ট হতে না পেরে রাষ্ট্রপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করতে আদালতে আবেদন করে।

এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা চাওয়া হয়।

লালদীঘিতে সেদিন যাদের মৃত্যু হয়েছিল, এথলেবার্ট গোমেজ কিশোর তাদের একজন।

তার আত্মীয় রডরিক্স কাম্পু সাংবাদিকদের বলেন, “ঘটনার পর এতগুলো বছর পেরিয়ে গেল। অবশ্যই এ ঘটনার বিচার হওয়া উচিত। পাশপাশি সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া উচিত।”

ওই দিনের ঘটনায় নিহত অন্যরা হলেন- মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত।

ঘটনার দিন আহত ছাত্রলীগ নেতা আবদুল মান্নান বলেন, “এখনও যদি বিচার শেষ না হয় তাহলে কখন শেষ হবে? দ্রুত বিচার হওয়া উচিত।”

ঘটনার পর ১৯৯২ সালের ৫ মার্চ আইনজীবী মো. শহীদুল হুদা বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন। কিন্তু তখনকার বিএনপি সরকারের সময়ে মামলার কার্যক্রম এগোয়নি।

মামলার বাদী মো. শহীদুল হুদাও মারা গেছেন। মারা গেছেন সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা এএসপি আব্দুল কাদের এবং আসামি পুলিশ কনস্টেবল বশির উদ্দিনও।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবীত হয়। আদালতের আদেশে সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম এবং অধিকতর তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অভিযোগপত্র দেয়া যাতে আসামি করা হয় আট পুলিশ সদস্যকে।

সেই আসামিরা হলেন- চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ কমিশনার মীর্জা রকিবুল হুদা, কোতোয়ালি অঞ্চলের পেট্রোল ইন্সপেক্টর জে সি মণ্ডল, কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মুশফিকুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।

১৯৯৮ সালে দেওয়া মামলাটির দ্বিতীয় অভিযোগপত্রে মোট ৭০ জনকে সাক্ষী করা হয়।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল এ মামলায় সাক্ষ্য দেন নিহতের স্বজন অশোক বিশ্বাস। বিচার শুরুর পর গত ২০ বছরে এ মামলার সাক্ষ্য দিয়েছেন মোট ৪৬ জন।

Facebook Comments