ইয়াওমুল জুমুআ (শুক্রবার), ১৫ নভেম্বর ২০১৯

রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে ঢাকার পূর্বাঞ্চল

নিজস্ব প্রতিবেদক:স্যাটেলাইট মডেল শহর হবে পূর্বাচল, ১২ লেনের সড়ক, ম্যাস র্সপিড ট্রানজিট (এমআরটি), দৃষ্টিনন্দন লেক, ভাসমান ইকোপার্ক, ৭০ হাজার আসনের ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসসহ অসংখ্য স্কুল কলেজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং আবাসন প্রকল্পে দৃষ্টিনন্দন হবে পুরো এলাকা

অত্যাধুনিক সেবা ও নাগরিক সুবিধার সংযোজনে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ স্যাটেলাইট শহরে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে পূর্বাচল। ১২ লেনের সড়ক, ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি-লাইন-১ মেট্রোরেল), দৃষ্টিনন্দন লেক, ভাসমান ইকোপার্ক, ৭০ হাজার আসনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসসহ অসংখ্য স্কুল, কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল এবং আবাসন প্রকল্পে সাজানো হচ্ছে পূর্বাচলকে। পূর্বাচল নতুন শহরকে মডেল হিসেবে ধরে বদলে যাচ্ছে ঢাকার পূর্বাঞ্চল। এমনকি এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। নগর বিশ্লেষক স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানুষের প্রয়োজনে শহর বড় হবে। ঢাকার উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পূর্বাচলকে কেন্দ্র করে করা হচ্ছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সংযোগে প্রবেশদ্বার হবে পূর্বাচল। তাই এই এলাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং যানজট নিরসনে লক্ষ্য রাখতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের পাশের দেশে প্লটের বদলে হাউজিং কমপ্লেক্স তৈরি করা হচ্ছে। এতে করে খোলামেলা পরিবেশে অনেক মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়। পূর্বাচলেও এই ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আইন এবং পরিকল্পনার ব্যত্যয় ঘটায় এমন কাজ যেন কেউ করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এখন আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের স্থপতি এবং নগরবিদ রয়েছেন। প্রয়োজনে তাদের সহযোগিতা নিয়ে এই প্রকল্পগুলোর কাজ সুষ্ঠুভাবে শেষ করতে হবে। রাজউক সূত্রে জানা যায়, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ। এ প্রকল্পের ১২ নম্বর সেক্টরে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। এখান থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল ফ্যাকাল্টিসহ বেশ কয়েকটি ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পূর্বাচল প্রকল্পের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এ প্রকল্পে ১৪২ তলা আইকনিক টাওয়ার তৈরি করা হবে। ইকোপার্ক, সবুজ পরিবেশ, পর্যাপ্ত উম্মু ক্ত স্থান, লেক সব মিলিয়ে বসবাসের এক অনন্য পরিবেশ হবে পূর্বাচল। এ প্রকল্পের প্রায় ৭০ ভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, ২৫ হাজার ১৬টি আবাসিক প্লটের বেশিরভাগই বরাদ্দপ্রাপ্তদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০টি ভবনের নকশা অনুমোদনও করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় ৬২টি সেতুর মধ্যে ৩৪টি নির্মিত হয়েছে। খুব শিগগিরই ওই প্রকল্পে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেবা নিশ্চিত করতে চায় রাজউক। সে লক্ষ্যে দ্রুতগতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। সরেজমিন পূর্বাচল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পূর্বাচল ৩০০ ফিট সড়কের দুই পাশে চলছে কর্মযজ্ঞ। বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, হাসপাতাল, বিভিন্ন সংস্থার হাউজিং সোসাইটির কাজ চলছে পুরোদমে। জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্প এলাকার ১০, ১২ ও ১৬ নম্বর সেক্টরে যথাক্রমে ‘আদমজি পাবলিক স্কুল ও কলেজ’, ‘জলসিঁড়ি পাবলিক স্কুল ও কলেজ’ এবং ‘বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ও কলেজ’ নামে তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ চলছে। এমআরটি অনুযায়ী পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রকম পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাপনাকে উন্নয়ন করতে মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ‘পূর্বাচল নতুন শহর’ প্রকল্প ১৯৯৫ সালে বাস্তবায়ন কাজ শুরু করে রাজউক। ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ স্বয়ংসম্পূর্ণ নতুন টাউনশিপ গড়ে তুলে ঢাকার ওপর আবাসন চাপ কমানোর লক্ষ্যে এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হলে এই শহরের বাসিন্দাদের কখনো লাইনে দাঁড়িয়ে বাড়ির ট্যাক্স কিংবা বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল দিতে হবে না। স্মার্ট কার্ডে ব্যাংকের বুথেই বিল প্রদানের সিস্টেম রাখা হবে। গাড়ির টিকিট কাটার প্রয়োজন পড়বে না। স্মার্ট কার্ডে যাবতীয় লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন বাসিন্দারা। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের ১, ২, ৪, ৬, ১১, ১২, ১৩, ১৭, ১৮, ১৯ ও ২০ নম্বর সেক্টরে ভূমি উন্নয়ন কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। এসব সেক্টরের সড়ক, ব্রিজসহ সেবা সংস্থার সংযোগ দেওয়ার কাজ চলছে। বহুল আলোচিত ১৪২ তলা ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে ১৯ নম্বর সেক্টরে। এ ছাড়াও পূর্বাচলে ১২ নম্বর সেক্টরে ১৩ একর জায়গাজুড়ে একটি ইকোপার্ক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে রাজউকের। এ ইকোপার্কের জন্য জায়গা রাখা হয়েছে লেকের ভিতর। চারদিকে লেক আর মাঝখানে ইকোপার্ক হওয়ায় এটা অনেকটা দ্বীপ আকৃতির হবে। লেকের পানির ওপর ইকোপার্কটি ভাসতে থাকবে। দূর থেকে মনে হবে ভাসমান পার্ক। পূর্বাচল প্রকল্পের কৃত্রিম লেকটি হবে আঁকাবাঁকা, যা প্রায় ৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। লেকের মাঝখানে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে স্থাপন করা হবে ইকোপার্ক। ইকোপার্কের সঙ্গে সংযোগ করা হবে ঝুলন্ত ব্রিজ। লেকে থাকবে ভাসমান রেস্তোরাঁ। পূর্বাচলে নির্মিত হবে ৭০ হাজার আসন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম। যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক সেবার পরিকল্পনায় পূর্বাচল নতুন শহর পরিণত হবে এশিয়ার শ্রেষ্ঠ স্যাটেলাইট শহরে। এই মডেল অনুসরণে যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক উন্নয়নে বদলে যাবে ঢাকার পূর্বাঞ্চল।

Facebook Comments