ইয়াওমুস ছুলাছা (মঙ্গলবার), ১২ নভেম্বর ২০১৯

মিলছে না ভেজালমুক্ত খাদ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাছে-দুধে ফরমালিন, ফলে কার্বাইড, শাক-সবজিতে কীটনাশক, জিলাপি চানাচুরে মবিল বিস্কুট সেমাই মিষ্টিতে কাপড়ের রং, মুড়িতে ইউরিয়া, শিশু খাদ্য আতঙ্কজনক

ভেজাল খাদ্যপণ্যে সয়লাব সারা দেশ। কী শহর, কী গ্রামীণ হাট-বাজার, সর্বত্রই ভেজাল। মাছে ফরমালিন, দুধেও ফরমালিন। ফল-ফলাদিতে দেওয়া হচ্ছে কার্বাইডসহ নানা বিষাক্ত কেমিক্যাল। শাক-সবজিতে রাসায়নিক কীটনাশক, জিলাপি-চানাচুরে মবিল। ব্রেড, বিস্কুট, সেমাইসহ সব রকম মিষ্টিজাত পণ্যে টেক্সটাইল-লেদারের রং, মুড়িতে ইউরিয়া-হাইড্রোজেনের অবাধ ব্যবহার চলছে। শিশুখাদ্য দুধও ভেজালমুক্ত রাখা যাচ্ছে না। বাজার, দোকান, সুপারশপ কোথাও ভেজালমুক্ত খাদ্যপণ্য মিলছে না।

দেশের একমাত্র পণ্যমান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বাজারে খাদ্যপণ্যে ন্যূনতম মানও নিশ্চিত করতে পারছে না। বরং লোকবল সংকটসহ নানারকম অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিজস্ব মামলার বেড়াজালে সংস্থাটি চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের বেশিরভাগ সময় তাদের ভেজালবিরোধী অভিযানও থাকছে। নিয়মিত মনিটরিং না থাকায় বিএসটিআইর মনোগ্রাম সমেত নিম্নমানের পণ্যও যত্রতত্র বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ আছে, মানসনদ পাওয়া যায় নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে। এ চক্রের তৎপরতায় ভেজাল পণ্যও খাঁটি হয়ে যায়! বিএসটিআই ভেজালকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে তার অধিকাংশই তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। অভিযোগ আছে, মামলা পরিচালনায় বিএসটিআই’র তৎপরতা কম। আবার অনেক ক্ষেত্রে মামলা করা হয় দুর্বল ধারায়। অথচ বিএসটিআইর রয়েছে নিজস্ব আইন বিভাগ। বিভাগীয় দুর্বলতায় সংস্থাটির অসহায়ত্ব ফুটে ওঠে। জনস্বাস্থ্য ও পণ্যমান ধরে রাখতে বিএসটিআই ঘিরে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা যেমন  কাজে আসছে না, তেমনি ভেজাল খাদ্যপণ্যের ছড়াছড়িও বন্ধ হচ্ছে না কোনোভাবেই। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার বিষয়টি বিশাল এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে বেশ কয়েকটি ধাপে খাদ্যে ভেজাল মেশানো হয়। আর এটি একদিনে দূর করাও সম্ভব নয়। এরই মধ্যে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বেশ কয়েকটি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে আগে ভেজাল খাদ্যেও যে ভয়াবহতা ছিল তা এখন তুলনামূলক কমে এসেছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে খুব বেশি সচেতন নন। এমনকি আমাদের ঘরবাড়িতে মানুষ সচেতনতার অভাবের জন্য অনেকেই ফ্রিজে কাঁচা খাবারের সঙ্গে রান্না করা খাবার সংরক্ষণ করছেন, যা ক্ষতিকর। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে খুব বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সরকার ও মিডিয়ার লোকজনও যে এ বিষয়ে খুব বেশি দিন আগে সচেতন হয়েছেন এমনটি নয়। দেশে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আইন থাকলেও ২০১৩ সালে এসে নিরাপদ খাদ্য আইনটি করা হয়। আর এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়। এমনকি দেশের খাদ্য ব্যবসায়ী ও প্রস্তুতকারীদের মধ্যেও অতি মুনাফার জন্য পণ্য বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভ করার মানসিকতা কাজ করে। ইতিবাচক বিষয় এই যে, খাদ্য নিরাপত্তার উদ্যোগ গ্রহণের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা এলাকার খাবারের দোকানগুলোতে স্টিকার লাগানো শুরু হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মহলকে এ বিষয়গুলোর নিবিড় তত্ত্বাবধান করতে হবে। আবার মালিকদের সচেতনতার সঙ্গে ভোক্তাদেরও নিরাপদ খাদ্যের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

মাছ চাষ থেকে শুরু করে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত ৮-১০ দফা প্রয়োগ করা হয় নানা ধরনের কেমিক্যাল। কলা, আম, পেঁপে, পেয়ারা, আনারস থেকে শুরু করে আপেল, আঙ্গুর, নাশপাতিসহ দেশি-বিদেশি প্রায় সব ফলেই মেশানো হচ্ছে কেমিক্যালের বিষ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাছ থেকে বাজারে বিক্রি পর্যন্ত একেকটি ফলে ছয় দফা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। মূলত গ্যাসজাতীয় ইথাইলিন ও হরমোন জাতীয় ইথরিল অতিমাত্রায় স্প্রে করা এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহারের কারণেই ফলগুলো রীতিমতো বিষে পরিণত হয়।

সবজি বাগানে কীট ও বালাইনাশক হিসেবে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা হচ্ছে। কীটনাশকের মধ্যে রিনকর্ড, সিমবুন, সুমিসাইডিন, হেপ্টাক্লোর, থায়াডিন, ডিডিটি ইত্যাদি বেশি বিপজ্জনক, যা সরাসরি শাক-সবজিতে প্রয়োগ করা হয়। যা মানুষের শরিরের জন্য অতি বিপদজনক। অতিরিক্ত রেডিয়েশনযুক্ত গুঁড়াদুধ আমদানি হচ্ছে দেদার, ছানার পরিত্যক্ত পানির সঙ্গে ভাতের মাড়, এরারুট আর কেমিক্যাল মিশিয়ে প্রস্তুতকৃত সাদা তরল পদার্থকে ‘গাভীর দুধ’ বলে সরবরাহ করা হচ্ছে। নোংরা পানি ব্যবহারের মাধ্যমে আইসক্রিম বানানো হচ্ছে ময়লা-আবর্জনার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে। বেকারির ব্রেড, বিস্কুট, কেক এবং আইসক্রিম, মিষ্টিসহ অন্য অনেক পণ্যেই চিনির পরিবর্তে অহরহ ব্যবহার হচ্ছে সোডিয়াম সাইক্লাইমেট। কাউন ও কাঠের গুঁড়া মিশিয়ে তৈরি করা হয় প্যাকেট মসলা। জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে জরুরি ‘পানি’ পর্যন্ত নিরাপদ থাকছে না। যত্রতত্র নকল কারখানা বানিয়ে পুকুর-ডোবা এবং ওয়াসার পানি সরাসরি গামছায় ছেঁকে বোতলজাত করা হচ্ছে। সে পানিতে থাকছে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম-লেড-ইকোলাই। অথচ এগুলোই ‘বিশুদ্ধ মিনারেল পানি’ হিসেবে নামিদামি কোম্পানির সিলমোহরে সরবরাহ হচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত খাদ্য নিরাপত্তা গবেষণাগারে দেশি-বিদেশি একদল গবেষক ৮২টি খাদ্যপণ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মহাখালী, গুলশান এলাকাসহ আরও বেশ কিছু বড় বড় বাজার থেকে এসব খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এতে গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যেই মানবদেহের জন্য সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি বিষাক্ত উপাদান শনাক্ত হয়। ওই গবেষণার ফলাফল অনুসারে ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনাতেই বিষাক্ত নানা কীটনাশকের উপস্থিতি মিলেছে। এ ছাড়া আম ও মাছের ৬৬টি নমুনায় পাওয়া গেছে ফরমালিন। চালের ১৩টি নমুনায় মিলেছে মাত্রাতিরিক্ত বিষক্রিয়া সম্পন্ন আর্সেনিক, পাঁচটি নমুনায় পাওয়া গেছে ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় ছিল সিসা ও অন্যান্য ধাতু। লবণেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। মুরগির মাংস ও মাছে পাওয়া গেছে মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। এ ছাড়া কয়েকটি প্যাকেটজাত জুসের নমুনায় পাওয়া গেছে বেঞ্জয়িক অ্যাসিড, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপজ্জনক। অতিমাত্রায় কীটনাশক, কেমিক্যাল আর রঙের আধিক্যতায় বেশির ভাগ খাদ্যপণ্যই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।

Facebook Comments