ইয়াওমুল জুমুআ (শুক্রবার), ১৫ নভেম্বর ২০১৯

কয়লার পর তিন লাখ ৬ হাজার টন পাথর উধাও

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির তদন্ত শেষ না হতেই এবার দেশের একমাত্র পাথর খনি দিনাজপুরের মধ্যপাড়াতেই ঘটেছে বড় রকমের পাথর উধাও এর ঘটনা। উত্তোলনকৃত পাথরের মধ্যে তিন লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যার বাজার মূল্য ৫৫ কোটি ২৬ লাখ টাকা। যদিও খনি কর্তৃপক্ষ বলছে পাথর উধাও হয়নি পদ্ধতিগত লোকসান হয়েছে।
এদিকে মধ্যপাড়া পাথর খনিটিতে ১২ বছরে ৪৭২ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, ঘাটতিকৃত পাথরের মূল্য যোগ করা হলে এই লোকসানের পরিমান আরো বৃদ্ধি পাবে। এই ঘটনায় পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে খনি কর্মকর্তাদের, খনির নিজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি পদ্ধতিগত ঘাটতি বললেও অপর পক্ষ বলছে ভিন্ন কথা। তবে খনি কর্তৃপক্ষ বলছে পাথরের ঘাটতি নাই, পাথর ইয়ার্ডে বিক্রয়ে অযোগ্য অবস্থায় পড়ে আছে পাথর।
খনি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সাল থেকে খনিটিতে বাণিজ্যিক ভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। চলতি সনের ৩১ জুলাই পর্যন্ত খনি থেকে পাথর উত্তোলন হয়েছে ৪১ লাখ ৭৫ হাজার ৭১০ মেট্রিকটন। এর মধ্যে ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত বর্তমান ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান জিটিসি পাথর উত্তোলন করেছে ২১ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিকটন। গত ১২ বছরে তিন লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি। তবে বর্তমান হিসেবের সাথে অনেক পার্থক্য দেখা দিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
মধ্যপাড়া পাথর খনিতে প্রথম পাথর ঘাটতি দেখা দেয় ২০১২ সালে এই নিয়ে খনিটির মার্কেটিং ও প্রশাসন বিভাগ একে অপরকে দোষারোপ করতে থাকে, সেই সময় ২ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন পাথর ঘাটতি দেখা দেয়। সেই সময় কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, তদন্তের প্রতিবেদন আর আলোর মুখ দেখেনি। এক সময় তা ধামাচাপা পড়ে যায়,কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কয়লা উধাও এর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নতুন করে পাথর ঘাটতির ঘটনাটি নজরে আসে।
সূত্রটি জানায় গত ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে পাথরের ঘাটতির হিসাব খনিটির পরিচালনা পর্ষদ এর নিকট উত্থাপন করে খনি কর্তৃপক্ষ। এ সময় পরিচালনা পর্ষদ খনিটির মহা-ব্যবস্থাপক (মার্কেটিং) আবু তালেব ফরাজিকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
এই তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছর থেকে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে পর্যন্ত উত্তোলনকৃত পাথরের হিসাবে ১৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ পাথরের পরিমাপ ভুল ও ১৪ দশমিক ৬২ শতাংশ পাথর পদ্ধতিগত ঘাটতি দেখানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় ২০০৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাথর উত্তোলন হয়েছে ১৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৬৯ মেট্রিকটন। ভুল পরিমাপ ও সিস্টেম লস বাদ দিলে উত্তোলনকৃত পাথরের হিসেব দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৮ হাজার ৫৬২ মেট্রিকটন। এখানে ঘাটতি দেখা যায় দুই লাখ ২৭ হাজার ২৩৩ মেট্রিক টন। অপরদিকে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ জুন পর্যন্ত উত্তোলনকৃত পাথরের দুই দশমিক ৩৫ শতাংশ সিস্টেম লস দেখানো হয়েছে, এতে ঘাটতি রয়েছে ২৬ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন। মোট ঘাটতি তিন লাখ ৫৯ হাজার ৮১৬ মেট্রিক টন।
গতকাল সোমবার মধ্যপাড়া পাথর খনিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১১টি পাথর ইয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৫টি ইয়ার্ডে পাথর আছে, বাকি ৬টি ইয়ার্ডে কোনো পাথর নেই।
খনিটির মহা-ব্যবস্থাপক (অপারেশন) আসাদুজ্জামান পাথর ইয়ার্ডগুলো ঘুরিয়ে বলে এই পাথর ইয়ার্ড গুলো ৪ থেকে ৫ ফিট গভীর ছিল, যা পাথর দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, যার একটি দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় ৫০০ ফিট করে। তিনি বলেন যে পরিমাণ পাথর হিসেবে ঘাটতি রয়েছে তা এই ইয়ার্ডের মধ্যে বিক্রি অযোগ্য হয়ে পড়ে আছে বলে তিনি দাবী করেন।
এদিকে এক বছরে এক লাখ টন পাথর কয়লা ইয়ার্ডে দেবে যাওয়ার কথা হাস্যকর বলে দাবী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবী বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির ন্যায় এই পাথর উধাও হয়েছে খনির কয়েক জন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সাথে পাথর উত্তোলনের যে চুক্তি হয়েছে, সেই চুক্তির পদ্ধতিতে দুর্নীতির অনেক সুযোগ রয়েছে।
জানা গেছে মধ্যপাড়া পাথর খনিতে ২০০৬ সাল থেকে কোরিয়ান নাম কোম্পানীর হাতধরে পাথর উত্তোলন শুরু হয়, কিন্তু আশানুরুপ পাথর উত্তোলন না হওয়ায়, খনিটি লোকসানের দিকে যায়। এই কারনে খনিটিকে লোকসানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য পাথর উত্তোলন বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পাথর উত্তোলন বৃদ্ধির জন্য ২০১৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জার্মানিয় ট্রাষ্ট কনসোডিয়াম (জিটিসি) এর সাথে প্রতিদিন ৫ হাজার করে পাথর উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ৬ বছরে ৯২ লাখ মেট্রিকটন পাথর উত্তোলনের চুক্তি করে। জিটিসি ২০১৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে পাথর উত্তোলন করছে। বর্তমানে খনিটিতে প্রতিদিন সাড়ে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৮শ মেট্রিকটন পাথর উত্তোলন হচ্ছে। এরই মধ্যে তিন লাখ ৬০ হাজার মেট্রিকটন পাথর উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটলো।

Facebook Comments