ইয়াওমুস সাবত (শনিবার), ১৬ নভেম্বর ২০১৯

সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতিতে দেশ,রফতানি কম !

আর.এফ.এন নিউজ :

সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতিতে দেশ,রফতানি কম !

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ। আমদানি ব্যয়ের তুলনায় রফতানি আয় কম হওয়ায় এ ঘাটতি বাড়ছে। অর্থাৎ রফতানি আয় যে হারে বাড়ছে আমদানি ব্যয় বাড়ছে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলার। স্বাধীনতার পর অর্থাৎ ৪৭ বছরে এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বাণিজ্য ঘাটতি বলে জানা গেছে। এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ২০১০-১১ অর্থবছরে। যার পরিমাণ ছিল ৯৯৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানি ব্যয় যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় রফতানি আয় না বাড়ায় বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক এবং সেবা খাতের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে চলতি হিসাবের ভারসাম্য। তাদের মতে, আমদানির এ প্রভাব উৎপাদনশীল খাতের বিনিয়োগে পড়লে তা অর্থনীতির জন্য ভালো। তবে এ অর্থ যদি পাচার হয়ে থাকে তাহলে ফল অত্যন্ত ভয়াবহ। বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে চাপের মুখে পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক গবেষণা পরিচালক জায়েদ বখত মানবকণ্ঠকে বলেন, সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের প্রয়োজনে অনেক আমদানি করছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকেও উদ্বুদ্ধ করছে। এতে মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ অন্য আমদানি বেড়েছে। ফলে মোট আমদানি বেড়েছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। শুধু তাই নয়, চলতি অর্থবছরে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে সাম্প্রতিক সময়ে সরকারকে প্রচুর পরিমাণে চাল আমদানি করতে হয়েছে। কিন্তু রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি আগের মতো নেই। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকায় এখনই উদ্বেগের কিছু নেই। একই বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রফতানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় অনেক বেশি হয়েছে। এ কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। এদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহও এখন কম। সব মিলিয়ে চলতি হিসাব ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। এ ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদি হলে তা অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আরো বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়লে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। তবে দেশে সে হারে বিনিয়োগ বাড়েনি। তাই আমদানির নামে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরো বলেন, বাণিজ্য ঘাটতির এ নেতিবাচক ধারা সার্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কারণ এটি অব্যাহত থাকলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের (রিজার্ভ) ওপর প্রভাব পড়বে; এক্সচেঞ্জ রেট বেড়ে যাবে। ফলে টাকার অবমূল্যায়ন বাড়বে। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হলো নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়। সে হিসাবে উন্নয়নশীল দেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। এতে বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয় না। ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উদ্বৃত্তের ধারা অব্যাহত থাকলেও বিদায়ী অর্থবছরে তা ঋণাত্মক ধারায় নেমে এসেছে। যা বর্তমানেও অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে ইপিজেডসহ রফতানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে দুই হাজার ১০৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় হয়েছে তিন হাজার ১১৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় এক হাজার ১২ কোটি ৩০ ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ৮২ টাকা হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। আলোচ্য সময়ে আমদানি বেড়েছে ২৫ দশমিক ২০ শতাংশ হারে। অন্যদিকে রফতানি বেড়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। ফলে চলতি হিসাবে ঘাটতি বড় হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছর জুড়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল। বৈদেশিক দায় পরিশোধে সরকারকে বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৪৮ কোটি ডলার (-) ঋণাত্মক হয়। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জানুয়ারি শেষে ৫৩৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার ঋণাত্মক হয়েছে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা। যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ঋণাত্মক ছিল ৮৯ কোটি ডলার।

আলোচ্য সময়ে পণ্যের পাশাপাশি সেবা বাণিজ্যেও ঘাটতি বেড়েছে। সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্য দেশকে যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছে সে তুলনায় পেয়েছে খুবই কম অর্থ। আলোচ্য সময়ে সেবাখাতে বিদেশিদের বেতনভাতা পরিশোধ করা হয়েছে ৫০৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ এ খাতে আয় করেছে মাত্র ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে সাত মাসে সেবায় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। যা গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল (ঘাটতি) ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার।

Facebook Comments