ইয়াওমুস সাবত (শনিবার), ০৬ জুন ২০২০

প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা নিলেন

আর.এফ.এন নিউজ :

 প্রধানমন্ত্রী ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা নিলেন

তিনি বলেন, আমি আপনাদের কাছে নৌকার পক্ষে ভোট চাই। আপনারা নৌকায় ভোট দেন, আমি আপনাদের উন্নয়ন দিতে পারবো। আমরা যদি নৌকায় ভোট পাই, আগামীতে ক্ষমতায় আসি আমাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকবে। আমরা আজকে দেশের উন্নতি করছি, কাদের স্বার্থে? আপনাদের স্বার্থে। নৌকা মার্কায় ভোট দিলে দেশের উন্নতি হবে। আমি আপনাদের কাছে ওয়াদা চাই, আপনারা আমার এই কথা মানুষের কাছে পৌছে দিবেন। নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আগামীতে ক্ষমতায় আনবেন।

বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় তিনি এ সব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রীর জনসভা উপলক্ষে পুরো পটিয়াজুড়ে পোস্টার ব্যানারে সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

বিশাল জনসমাবেশে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, আমরা দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাদেরকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছি। এই মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণই আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি। এ কথা ভুললে চলবে না।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানাতে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন,  ‘দুস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাদেরকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছি। কারণ, এই মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের জন্যই আমরা আমাদের স্বাধীনতা পেয়েছি একথা ভুললে চলবে না। কাজেই তাদেরকে আমাদের সম্মান দিতেই হবে। তাদের ছেলেমেয়ে, নাতিপুতি পর্যন্ত যাতে চাকরি পায় তার জন্য কোটার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর যদি কোটায় না পাওয়া যায় তাহলে যারা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী তাদের চাকরি দেওয়া যাবে। কিন্তু, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আমাদের এই বিশেষ ব্যবস্থা করতেই হবে। কারণ, তাদের আত্মত্যাগের কারণেই তো আজকের এই চাকরির সুযোগ। আজকে এই স্বাধীনতা, আজকে মানুষের এই উন্নয়ন সব তাদের জন্য। যদি দেশ স্বাধীন না হতো তাহলে কোনও উন্নয়নও হতো না, কারও কোনও চাকরিও হতো না। কোনও উচ্চ পদেও কেউ যেতে পারতো না এ কথাটা ভুললে চলবে না। তাই তাদেরকে আমরা সম্মান দেই।’

দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ গৃহহারা থাকবে না। কেউ কুঁড়ে ঘরে থাকবে না। যাদের জমি নেই, তাদের খাস জমি দেবো। যাদের টাকা নেই, তাদেরকে টাকা দেব। একটি মানুষও কুঁড়ে ঘরে থাকবে না, থাকেও না। আওয়ামী লীগ আসলে উন্নয়ন হয়।

জঙ্গিবাদের উত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন,  তারা (বিএনপি-জামায়াত জোট) এই দেশে শায়েখ আবদুর রহমান বাংলা ভাইয়ের মতো জঙ্গি সৃষ্টি করেছে। তারা সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। এই চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র পাচার করার সময় উদ্ধার করা হয়েছে। কে করেছে এটা? তার ছেলে তারেক রহমান। ক্ষমতায় থাকতে কালো টাকা বানিয়েছে আবার কালো টাকা সাদা করেছে। এত টাকা আসে কোথা থেকে? মানি লন্ডারিং করেছে, দুর্নীতি করে টাকা পাচার করেছে। তারা দুর্নীতি করে ধরা পড়েছে। এ জন্য সিঙ্গাপুর কোর্টে বিচার হয়েছে। সিঙ্গাপুর থেকে টাকা এনে বাংলাদেশের টাকা বাংলাদেশের জনগণের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই মাটিতে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ স্থান হবে না। বাংলাদেশ হবে শান্তির দেশ।

তিনি বলেন, ‘আজকে এতিম খানার জন্য টাকা আসছে। কোরান শরীফে লেখা আছে এতিমের হক কেড়ে নিও না। এতিমের সম্পদ লুট করো না, এতিমকে তার ন্যায্যা হক দিয়ে দাও। সেই কোরান শরীফের নির্দেশ না মেনে এতিমের নামে টাকা এনে সব নিজেরা আত্মসাৎ করেছে। মামলা তো আওয়ামী লীগ সরকার দেয়নি। দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার কারা? তারই বেছে নেওয়া মাঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন-ইয়াজউদ্দিন। তারাই দিয়েছে মামলা, সেই মামলায় আজ শান্তি হয়েছে। সেই সময় দুর্নীতি দমন কমিশন এই মামলা করেছে, কোর্ট রায় দিয়েছে। কোর্টের রায়ও তারা মানে না। এটাই তাদের চরিত্র।

বিএনপির উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তারা আইন মানবে না, কানুন মানবে না, কিছুই মানবে না। মানুষের সম্পদ কেড়ে খাবে, এতিমের টাকা কেড়ে খাবে। শাস্তি দিলো কেন এ জন্য হুমকি-ধমকি আন্দোলন করছে। কিন্তু, জনগণ কোনও দুর্নীতিবাজ, জঙ্গি, সন্ত্রাসীর সঙ্গে নাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দেইনি বলে ক্ষমতায় আসতে পারলাম না। আমেরিকার গ্যাস কোম্পানি বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করবে ভারতের কাছে। আমেরিকা ষড়যন্ত্র করে আমাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দিলো না। চট্টগ্রামসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে, এত নাম বলেও শেষ করতে পারবো না। জামালউদ্দিনকে অপহরণ করে নিয়ে গেলো বিএনপির লোক। ৬ মাস পর তার কঙ্কাল পাওয়া গেলো। তারা শুধু আমাদের দলের নেতাকর্মীদের হত্যা করেছে তা নয়, নিজের দলের নেতাকর্মীদেরও ছাড়ে নাই।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওয়াদা করেছিলাম যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবো, করেছি। বিচার করে রায়ও কার্যকর করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছি। আমরা দেশকে উন্নয়ন করতে চাই। আমার একটাই চিন্তা এ দেশ আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। বাবা-মা বুকের রক্ত দিয়ে গেছে। আমি চাই প্রতিটি মানুষ উন্নত জীবন পাবে। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সবাই উন্নত সুন্দর জীবন পাবে। আমার রাজনীতি জনগণের কল্যাণের, জনগণের উন্নয়নের জন্য। আমার রাজনীতি জনগণের কল্যাণের জন্য, প্রতিটি মানুষের উন্নত-সুন্দর জীবনের জন্য। তিনি বলেন, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। জাতির পিতা এই দেশে স্বাধীন করে দিয়ে গেছে। আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছি। বিশ্ব সভায় মাথা উচু করে, কারো কাছে হাত পেতে নয়। কেউ ভিক্ষুকের অপবাদ দিতে পারবে না। আপনারা জানেন পদ্মা সেতু নিয়ে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিলো বিশ্বব্যাংক। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম, আমাদের নিজেদের টাকায় পদ্মা সেতু করে দেখাবো। আমারা সেই চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করছি। পদ্মা সেতু এখন নির্মাণ সম্পন্নের পথে।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি একটা কথা বলতে চাই, বাবা-মা হারিয়েছি। ভাইদের হারিয়েছি। একজন আপনজন হারালে আপনারা কি সেই কষ্ট সইতে পারেন? আর একই দিনে আমি আমার মা-বাবা, তিন ভাই, ছোট্ট রাসেল ও ভাইয়ের বৌদের, একমাত্র চাচা, মেজো ফুপু, সেজো ফুপুর বাড়িতে আক্রমণ করে কাউকে বাঁচতে দেয়নি।

আমরা চাই আমাদের দেশ এগিয়ে যাক। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য লজ্জার ব্যাপার যে যুদ্ধাপরাধীরা ক্ষমতায় বসে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ২৮টি প্রকল্প উদ্বোধন করে গেলাম। আরো কিছু প্রকল্পের কাজ চলছে। আরও কিছু প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এই উন্নয়নগুলি আপনাদের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে কাজে লাগবে। কক্সবাজার পযন্ত চার লেন করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আমরা উড়াল সেতু করে দিচ্ছি। কর্ণফুলি তৃতীয় সেতু করে দিচ্ছি। সার্বিক উন্নয়নে চট্টগ্রাম জেলা ও চট্টগ্রাম বিভাগ যদি দেখেন গ্রামীণ পযায় পযন্ত উন্নয়ন হয়েছে।

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভা সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান।

সভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোশাররফ হোসেন, প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সভাপতি নুরুল আলম চৌধুরী, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আবদুস ছালাম, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন প্রমুখ। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, এনামুল হক শামীম, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, উপ প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন প্রমুখ।

এর আগে বেলা তিনটা ১০ মিনিটে জনসভাস্থলে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম স্লোগান ওঠে জনসভাস্থলে। ‘বিশ্ব নেত্রীর আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘শেখ হাসিনা’, ‘শেখ হাসিনা’ স্লোগান চলতে থাকলে হাত নাড়িয়ে অভিবাদন জানান তিনি। পরে ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর ও ১৩টি উন্নয়ন প্রকল্পের উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বুধবার বেলা তিনটায় জনসভা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই জনসমুদ্রে পরিণত হয় জনসভা স্থল। সকাল থেকেই আশপাশের উপজেলা থেকে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে জনসভায় আসতে শুরু করে স্থানীয় নেতাকর্মীরা। শেখ হাসিনার আগমনী বার্তায় রাজপথ ভরে ওঠে। নেতাকর্মীদের মুহুর্মুহু স্লোগানে প্রকম্পিত হয় পুরো এলাকা। তীব্র রোদ্র উপেক্ষা করে বিদ্যালয় মাঠে অবস্থান নেন জনসভায় যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীরা। বেলা ১২টার মধ্যেই জনসভাস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। প্রায় ১৭ বছর পর চট্টগ্রামের পটিয়ায় আসেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে বরণ করে নিতে সাজ সাজ রব ছিল পটিয়ায়। প্রতিটি মোড় ছেয়ে গিয়েছে ব্যানার-ফেস্টুনে। পাশাপাশি বড় বড় বিলবোর্ড আর তোরণে শোভা পাচ্ছে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের চিত্র। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার এটাই প্রথম পটিয়া সফর। একারণে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পটিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল ৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩২ ফুট প্রস্থের নৌকা আকৃতির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর জনসমাবেশে ৩টি প্রবেশপথ রাখা হয়। জনসভার প্রস্তুতি হিসেবে দিনব্যাপী মাইকিং করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উৎসবে পিছিয়ে ছিলেন না আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীরাও। সড়কের মোড়ে মোড়ে অমুককে এমপি হিসেবে দেখতে চাই লেখা তোরণ ও বিলবোর্ডও ছিল চোখে পড়ার মতো।

দেশবাসীর জন্যে বুকের রক্ত দেওয়ার ওয়াদা করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজনে বুকের রক্ত দিয়ে হলেও আপনারদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে সুন্দর জীবন দিবো। সেই ওয়াদা করছি। দেশবাসীর জন্য যে কোনো ত্যাগ শিকারে প্রস্তুত। যেভাবে আমার পিতা আপনাদের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন।বিএনপি ও জামায়াতের কর্মকাণ্ডকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে মানুষ খুন করে, লুটপাট করে। তাদের হাত থেকে কেউ রেহাই পায় না। নির্বাচন ঠেকানোর নামে ২০১৪ সালে ও সরকার হটানোর নামে ২০১৫ সালের আগুন সন্ত্রাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের হাত থেকে মামা-বাবা থেকে শুরু কোলের শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি। ড্রাইভার-হেলপার কেউ না। খালেদার নির্দেশে পুড়িয়ে মারা হয়েছে এসব মানুষকে। 

Facebook Comments