ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ১৪ নভেম্বর ২০১৯

আওয়ামী ওলামা লীগ নিয়ে সংশয়

আওয়ামী ওলামা লীগ নামে কোনো সংগঠন চালানোর পক্ষে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। একাধিক ভাগে বিভক্ত এই সংগঠনটি আওয়ামী লীগের সহযোগী বা ভ্রাতৃপ্রতিম কোনো সংগঠন নয়। আওয়ামী লীগ সমর্থক সংগঠন হিসেবে এটি কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এবার আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা এই সংগঠনটির কার্যক্রম স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে দলের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, আজ সোমবার ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একটি সভায় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে নতুন একটি সংগঠন দাঁড় করানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। অর্থাৎ, আওয়ামী ওলামা লীগ আর থাকছে না।

ওলামা লীগ নিজেদের আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে প্রচার করলেও তাদের অনেক দাবিদাওয়া বিভিন্ন সময় প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংগঠনটি কয়েক বছর ধরে পাঠ্যপুস্তকে ইসলামবিরোধী রচনা ও পাঠ্যক্রম আছে বলে দাবি করে তা বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। একই দাবি তুলেছিল হেফাজতে ইসলামও। বর্তমান শিক্ষানীতিকে ইসলামবিরোধী আখ্যাও দেয় ওলামা লীগ। তারা মেয়েদের বিয়ের বয়স নির্ধারণে বিরোধিতা, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন প্রণয়নের দাবি, পয়লা বৈশাখবিরোধী বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছে; যা হেফাজতে ইসলামসহ অন্য ধর্মীয় সংগঠনের কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণেও বিবৃতি দেয় সংগঠনটি।

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ওলামা লীগের ব্যাপারে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকেই বিরক্ত। আজ কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রায় সবাই ওলামা লীগের বিষয়ে নিজেদের আপত্তির কথা জানান। তাঁরা নতুন করে ইসলামি ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি নতুন সংগঠন গঠনের পরামর্শ দেন। এ সময় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জানান, দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা ওলামা লীগের কার্যক্রম স্থগিত করে দিয়েছেন। এরপরই নতুন সংগঠন দাঁড় করানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

জানতে চাইলে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ওলামা লীগ আওয়ামী লীগের কোনো সংগঠন নয়। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নামে কোনো কার্যক্রম না চালাতে ওলামা লীগের নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রকৃত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে নতুন একটি সংগঠন দাঁড় করানোর বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে না থাকলেও কয়েকজন মন্ত্রী ও দলের কিছু কেন্দ্রীয় নেতার ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা আওয়ামী ওলামা লীগ নামে দুটি গ্রুপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময়ে উভয় গ্রুপের কিছু কর্মসূচিতে দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।

ওলামা লীগের একটি অংশের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দাবিদার যথাক্রমে মাওলানা মুহাম্মদ আখতার হোসাইন বুখারী ও মাওলানা মো. আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরি। অপর অংশের সভাপতি মাওলানা ইলিয়াস হোসাইন হেলালী ও সাধারণ সম্পাদক বেলাল হোসেন।
২০১৫ সালের অক্টোবরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ওলামা লীগের দুই অংশ মারামারিতে লিপ্ত হয়। এর আগের মাসে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটে ওলামা লীগের একাংশের সভাপতি ইলিয়াস বিন হেলালীকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। এসব হামলার পেছনে সংগঠনের কোন্দলকেই দায়ী করেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

ওলামা লীগের উভয় পক্ষের আওয়ামী লীগের নীতি-আদর্শের পক্ষে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের নেত্রী বলে দাবি করলেও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ও কার্যক্রমের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির মিল পাওয়া যায়। সংগঠনটির উভয় পক্ষই ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে তাদের দলীয় কার্যালয় বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রচার করছে।

আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রের ‘লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, মূলনীতি ও উন্নয়ন দর্শন’ অংশে বলা হয়েছে, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত সংবিধানে বিধৃত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সকল ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভীষ্ট লক্ষ্য।’

জানতে চাইলে ওলামা লীগের একাংশের সাধারণ সম্পাদক মো. আবুল হাসান শেখ শরীয়তপুরি প্রথম আলোকে বলেন, ওলামা লীগের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। গত শনিবারও সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণসহ নানা দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে। নতুন সংগঠন দাঁড় করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, নতুন সংগঠনে তাঁরা অংশ হবেন। তাঁদের না নেওয়া হলে কী করবেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুর্দিনে তাঁরা আওয়ামী লীগের পক্ষে মাঠে ছিলেন। এখন না নিলে আলোচনা করে করণীয় ঠিক করবেন।

Facebook Comments