ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ১৪ নভেম্বর ২০১৯

১৩৭ বছরের মধ্যে সর্বাধিক তাপমাত্রা

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নতুন মাত্রায় পৌঁছে গেছে। গত ১০ মাসের গড় তাপমাত্রা ১৩৭ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে  পরিমাপ করেছেন বিজ্ঞানীরা। এটি শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার ও বন কমে যাওয়া বা গ্রিন হাউজ গ্যাসের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই হচ্ছে তা নয়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পর্যাবৃত্ত পরিবর্তন এল নিনোর প্রভাবেও এমনটি হচ্ছে। আর এই বহমান তাপমাত্রা আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।

এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যাবে। ফলে হিটস্ট্রোকসহ নানা ধরনের রোগ যেমন বাড়বে তেমনি মানুষের কর্মক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা যাবে কমে। ইকোলজিক্যাল (বাস্তুতন্ত্র) সমস্যার সৃষ্টি হয়ে মাছ, ঘাস ও কৃষির ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় কৃষি খামার ও মৎস্য সম্পতের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়নশীল দেশগুলোই এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, অতিরিক্ত গরমের ফলে জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দু’ভাবেই প্রভাব পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুচক্র স্বাভাবিক থাকে না। আর চলতি বছর এল নিনোর প্রভাবে ঋতুচক্র আরও কম (শীতকালে শীত) অনূভূত হবে। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে অস্বস্তিকর গরম চরম আকার ধারণ করতে পারে।

এল নিনো হচ্ছে বায়ুমণ্ডলীয় এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের সমুদ্রগুলোর মাঝে একটি পর্যাবৃত্ত পরিবর্তন। এটির সংজ্ঞা এভাবে দেয়া যেতে পারে, যখন তাহিতি এবং ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বায়ুমণ্ডলে চাপের পরিবর্তন সংঘটিত হয় তখন এবং যখন পেরু ও ইকুয়েডরের পশ্চিম উপকূল থেকে অস্বাভাবিক গরম অথবা ঠান্ডা সামুদ্রিক অবস্থা বিরাজ করে তখন। এল নিনো হচ্ছে পর্যায়বৃত্তের উষ্ণ পর্যায়, আর লা নিনা হচ্ছে শীতল পর্যায়। পর্যায়বৃত্ত এই পরিবর্তনের কোন নির্দিষ্ট সময় নেই, তবে প্রতি ৩ থেকে ৮ বছরের মাঝে দেখা যায়। (উইকিপিডিয়া)

এল নিনো বন্যা, খরা এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সম্পর্কযুক্ত। উন্নয়নশীল যেসব দেশ কৃষিকাজ এবং মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল, তারাই এল নিনো দ্বারা অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় ১/২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম হয়ে উঠেছে। বর্তমানে যে এল নিনোর প্রভাব ছড়িয়েছে তা এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ এবং শক্তিশালী। গত ১৭ মাস ধরে এল নিনো অবস্থান করছে যাকে অনেকেই ডাবল এল নিনো বলেও উল্লেখ করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওসেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানায়, ১৯৫০ সালের পর থেকে এবারের এল নিনো সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী।

তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত
আগেই বলা হয়েছে, গত ১০ মাসের গড় তাপমাত্রা যে কোনো বছরের একই সময়ের গড় তাপমাত্রার রেকর্ড ১৩৭ বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা জানিয়েছে, চলতি সহস্রাব্দ শুরুর পর উষ্ণতম মাসের রেকর্ড ভাঙার ঘটনা ঘটেছে ৩৭টি।

এ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বের এই উষ্ণায়নের অন্যতম মূলে রয়েছে মানুষের উৎপাদিত গ্রিনহাউজ গ্যাস। এছাড়া এল নিনোর প্রভাবও রয়েছে। আর তার প্রভাবে চলতি বছরটিই পরিণত হতে পারে বিশ্বের ইতিহাসের উষ্ণতম বছরে।

স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ মে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৫ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাজশাহীতে। ১৯৯৫ সালে ৪৩ ও ২০০৯ সালের ২৬ এপ্রিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস যশোরে। ১৯৬০ সালের দিকে বঙ্গীয় এলাকায় সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত করা হয়। এ বছর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক শাহ আলম বাংলামেইলকে বলেন, বৃষ্টি না হওয়াতে গরম বেশি অনূভূত হচ্ছে। এটা মানুষের জীবনে অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। তাপমাত্রা এখনো সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। যদি আরও বাড়ে তখন স্ট্রোকসহ বিভিন্ন ধরনের অসুখ দেখা দিতে পারে। তাপমাত্রা আরো বাড়বে বলেই আশঙ্কা করছেন তিনি।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আবহাওয়া অধিদপ্তরের গত ৩৫ বছরের (১৯৮১-২০১৬) দৈনিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৯৮১ থেকে ১৯৯২ পর্যন্ত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে (মার্চ, এপ্রিল, মে) স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। পরবর্তী ২০ বছর (১৯৯২-২০১২) স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ শতাংশ কম এবং পরবর্তী ৪ বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ওঠানামা করেছে। বর্তমানে প্রাক-বর্ষা মৌসুমে দেশের গড় তাপমাত্রা বাড়ছে।

২০০৪ সালে বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশের উপরে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৬৯ হাজার ৯০৫ মিলিমিটার (মিমি)। ২০০৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৪৫৮ মিমি, ২০০৬ সালে ৫৩ হাজার ৩৭২ মিমি, ২০০৭ সালে ৬৬ হাজার ৫২০ মিমি, ২০০৮ সালে ৬০ হাজার ৫৫১, ২০০৯ সালে ৫৬ হাজার ১৬৩ মিমি, ২০১০ সালে ৪৭ হাজার ৪৪৭ মিমি ও ২০১১ সালে ৪৩ হাজার ৫৭২ মিমি বৃষ্টিপাতের কথা জানায় অধিদপ্তর।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ড এক গবেষণায় বলেছে, শুধু ঢাকা শহরেই মে মাসের গড় তাপমাত্রা ১৯৯৫ সালের পর ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের আদ্রতার মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১০-১৫ ভাগ এবং ২০৭৫ নাগাদ তা প্রায় ২৭ ভাগ বেড়ে যাবে। ফলে বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যাবে চরম হারে। এই আর্দ্রতা গরম বাড়িয়ে দিবে।

স্বাস্থ্য
গরমে নানারকম স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। চলতি বছর এক লাখের বেশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে কাজ করার কারণে দিন দিন কর্মক্ষমতা কমে যায়। লবণ পানি কমে যাওয়ায় হিটস্ট্রোক বেড়ে যেতে পারে।

প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেনিন বলেন, অতিরিক্ত গরমের ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। এতে পানিশূন্যতা ও ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়। হিটস্ট্রোকের পরিমাণ বেড়ে যায়। শরীর কামড়ানো ও ব্যথা করে। ডায়রিয়া, বমি, ঠান্ডা ও জ্বর বেড়ে যায়। টাইফয়েডসহ অন্যান্য পানিবাহিত রোগও বেড়ে যায়। গরমের কারণে মানুষের কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা কমে যায় বলেও জানান তিনি।

পরিবেশ
সম্প্রতি এনওএএ ও ন্যাশনাল সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল ইনফরমেশন (এনসিইআই) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের তাপমাত্রা ছিল অন্য যে কোনো বছরের গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি। বিশ শতকের মার্চ মাসগুলোর গড় তাপমাত্রার তুলনায় এ বছরের মার্চে তাপমাত্রা ১ দশমিক ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। আর আগের রেকর্ড ২০১০ সালের মার্চ মাসের চেয়েও এ বছরের মার্চ মাসে তাপমাত্রা বেশি ছিল ০.৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ বছরের প্রথম তিন মাসের গড় তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ১ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

ঢাবির ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বাংলামেইলকে বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। আমরা যা করছি তারই ফলাফল ভোগ করছি। এই তাপমাত্রা চলমান থাকলে জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়বে এবং পড়ছে। অতিরিক্ত গরমের ফলে আমরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছি। মাছ ও ঘাসের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। তবে তা কতটা ভয়াবহ হবে তা গবেষণার বিষয়। গত বছরের তুলনায় এবার গরম বেশি, আগামী বছর হয়তো আরো বাড়বে।

ঢাবির (জীববিজ্ঞান অনুষদ) মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরী  বলেন, সিলেটে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। আর ঢাকায় আমরা গরমে হাসফাস করছি। তবে এভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। এতে সাময়িক প্রভাব পড়ছে। তবে ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশে স্ট্রংলি বাফার কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির সম্ভাবনা কম।

Facebook Comments