সাবত (শনিবার), ২০ এপ্রিল ২০২৪

রপ্তানি কমছে চিংড়ির

নিউজ ডেস্ক: আদিকাল থেকে মাছের সাথে চিংড়ি দেশের নদ নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে পাওয়া যেত। খেতে সুস্বাদু তাই মানুষের কাছে এর কদর বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় একসময় চাষ শুরু করে এদেশের মানুষ। প্রায় চারদশক ধরে চিংড়ির চাষ চলছে, দেশের চাহিদা মিটিয়ে একসময় রপ্তানিও শুরু হয়। এভাবে বড় বাণিজ্য খাতে পরিণত হয় দেশের চিংড়ি চাষ। বিশ্বে এখন চিংড়ি চাষ করে এমন ১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। দেশের হিমায়িত খাদ্য রপ্তানির বড় অংশই হলো চিংড়ি। এ খাতের ৮০ শতাংশের বেশি আয় আসে চিংড়ি থেকে। কিন্তু গেল চার বছর ধরে চিংড়ি রপ্তানি আয় কমেই চলেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৭০৬ টন চিংড়ি রপ্তানি করে ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হয়। আর সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতের আয় আরও ৪ কোটি ডলার কমে যায়। ৪০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে নেমে আসে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪৫ কোটি ডলারের চিংড়ি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হলেও ঘাটতি থেকে যায় ৯.১৮ শতাংশ। যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ কম।

বাগদা, গলদাসহ মাত্র পাঁচ প্রজাতির চিংড়ি চাষ করা হয় দেশে। প্রকৃতি ও চাষ এ দুই উৎস থেকে এক মৌসুমেই প্রায় ৩ লাখ টন চিংড়ি পাওয়া যায়। যার চার ভাগের এক ভাগ রপ্তানি হয় আর বাকিটা দেশের চাহিদা পূরণ করে। উৎপাদিত চিংড়ি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্য ও বেলজিয়ামে রপ্তানি হয়। সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় বেলজিয়ামে।

বাংলাদেশে চিংড়িকে বলা হয় সাদা সোনা। আন্তর্জাতিক বাজারে অসম প্রতিযোগিতা ও দেশের বাজারে উৎপাদন কমাসহ বিভিন্ন সংকটে পড়েছে দেশের চিংড়ি রপ্তানি বাজার। এর ফলে ধারাবাহিকভাবে কমছে সাদা সোনা বা হোয়াউট গোল্ড খ্যাত এ পন্যের রপ্তানী আয়।

চিংড়ি রপ্তানি আয় কমার পেছনে সংশ্লিষ্টরা আন্তর্জাতিক বাজারের অসম প্রতিযোগিতাকেই বেশি দায়ি করেন। প্রতিযোগী দেশগুলো কম দামের চিংড়ি বেশি উৎপাদন করছে আর কম দামে বাজারে সরবরাহ করছে। যেহেতু বাংলাদেশের গলদা ও বাগদা চিংড়ি ব্যাপক হারে চাষ হয়। উন্নত মানের এ চিংড়ির দামও বেশি। তাই দেশের চিংড়ির বাজার হুমকির মুখে পড়ছে।

অপরদিকে, প্রতিযোগী দেশ ভারত ও ভিয়েতনাম বিকল্প জাত ভেনামি চিংড়ি চাষ করে। বাগদা চিংড়ির তুলনায় ভেনামি চিংড়ির দাম অনেক কম এবং উৎপাদন বেশি হয়। বাগদা চিংড়ির চেয়ে ভেনামি চিংড়ির উৎপাদন খরচ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কম হয়। রপ্তানিতেও পাউন্ডে দুই ডলার কম হওয়ায় বিদেশি ক্রেতারা ভেনামি চিংড়ির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। আর বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনে অনুমতিও নেই। আবার সেমি ইনসেন্টিভ প্রযুক্তিতে যে চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে তার ৯০ শতাংশই মারা যাচ্ছে আবহাওয়ার কারণে। অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ীরা ওজনে বেশি দেখানোর জন্য চিংড়িতে অপদ্রব্য ঢুকিয়ে (পুশ) রপ্তানি করে যা দেশের বাজার নষ্ট করছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) তথ্য মতে, গত চার বছরের হিমায়িত চিংড়ি রপ্তানির হার ক্রমাগত কমছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন চিংড়ি রপ্তানি করে ৫৫ কোটি ডলার আয় হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ২৭৮ টন চিংড়ির বিপরীতে আয় হয় ৫১ কোটি ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার ২৭৬ টন চিংড়ি থেকে আয় আসে ৪৫ কোটি ডলার। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে গেল চার বছর ধরে চিংড়ির রপ্তানি কমছে।

চিংড়ি উৎপাদন, বাজারজাতকরণ ও রপ্তানী পর্যন্ত আট থেকে ১০ ধাপ পার হতে হয়। এতে মাঠের চাষীরা দাম পায় অনেক কম। এছাড়া চিংড়ি রপ্তানিকারকদের নিয়েও চাষীদের আছে নানা অভিযোগের জায়গা। বছরের প্রায় তিন মাস সমুদ্রে মা চিংড়ি আহরণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হ্যাচারিগুলো মা চিংড়ি পাচ্ছে না। চাষিদের কাছেও প্রয়োজনমত চিংড়ি পোনা পৌঁছায় না। তাই উৎপাদন কমে গেছে অনেকাংশে। কিন্তু এ খাতকে ধরে রাখতে হলে বা আগের অবস্থান ফিরে পেতে হলে রপ্তানি বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তরান্বিত করার পাশাপাশি বাড়াতে হবে উৎপাদনও।

বিকল্প হিসেবে দেশে বাগদার উৎপাদন খরচ কমানো যেতে পারে। অথবা দেশে ভেনামি চিংড়ি চাষ শুরু করা যেতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি উৎপাদনে সরকারিভাবে অনুমতি না থাকায় উৎপাদনও করতে পারে না চাষিরা। তাই চিংড়ি রপ্তানি বাড়াতে প্রয়োজন কিছু পদক্ষেপ। দরকার সরকারি-বেসরকারি হস্তক্ষেপ।

রপ্তানি বাড়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে, বাড়াতে হবে চিংড়ি চাষীদের আগ্রহ। চিংড়ি চাষ ও বাণিজ্যের সাথে দেশের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বিদেশে চিংড়ি রপ্তানী দেশে চিংড়ি চাষীদের সবচেয়ে বড় উৎসাহ জোগায়। কিন্তু যেখানে রপ্তানির জৌলুসটাই তাদের চিংড়ি চাষে উদ্বুদ্ধ করে আসছে। সেই রপ্তানির চিত্রও যখন হতাশাব্যঞ্জক, তখন দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্দ্যোগ না নিলে দেশের মাটিতে চিংড়ি চাষও হুমকির মুখে পড়তে বাধ্য।

Facebook Comments Box