আহাদ (রবিবার), ২২ মে ২০২২

ভ্রাম্যমাণ মৌ চাষ, লাভবান হচ্ছেন চাষিরা

টাঙ্গাইল সংবাদাদাতা: টাঙ্গাইলে ফসলের মাঠে যত দূর চোখ যায় শুধু হলুদ আর হলুদ। সরিষা ফুলের চাদরে ঢাকা প্রকৃতি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। চলতি মৌসুমে জেলায় সরিষা চাষ লক্ষ্যমাত্রা ছারিয়েছে। এদিকে ফুল থেকে প্রতিবছর মধু সংগ্রহ করছেন ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা। ফলে লাভবান হচ্ছেন উভয় চাষি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১২টি উপজেলায় মোট ৪৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে ৫৪ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে ৫০ হাজার ৪৮৮ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫ হাজার ২৯০ হেক্টরে ৬ হাজার ৩৪৮ মেট্রিক টন, বাসাইলে ৪ হাজার ৮২০ হেক্টরে ৫ হাজার ৭৮৪ মেট্রিক টন, কালিহাতীতে ৩ হাজার ১৩০ হেক্টরে ৩ হাজার ৭৫৬ মেট্রিক টন। ঘাটাইলে ২ হাজার ৩৫৫ হেক্টরে ২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন, নাগরপুরে ১০ হাজার ১০০ হেক্টরে ১২ হাজার ১২০ মেট্রিক টন, মির্জাপুরে ৮ হাজার ৯৫০ হেক্টরে ১০ হাজার ৭৪০ মেট্রিক টন, মধুপুরে ৪৬৫ হেক্টরে ৫৫৮ মেট্রিক টন, ভূঞাপুরে ১ হাজার ৮৩০ হেক্টরে ২ হাজার ১৯৬ মেট্রিক টন, গোপালপুরে ৩ হাজার ৬০০ হেক্টরে ৪ হাজার ৩২০ মেট্রিক টন, সখীপুরে ২ হাজার ১৪০ হেক্টরে ২ হাজার ৫৬৮ মেট্রিক টন, দেলদুয়ারে ২ হাজার ৫৫০ হেক্টরে ৩ হাজার ৬০ মেট্রিক টন, ধনবাড়ী উপজেলায় ৪৭০ হেক্টরে ৫৬৪ মেট্রিক টন।

আরও জানা যায়, টাঙ্গাইলে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের বারি-১৪ ও বারি-১৫ এবং স্থানীয় জাতের (পেচি/টরি-৭) সরিষা জেলায় বেশি আবাদ হয়ে থাকে। এছাড়া বারি-৯, বিনা-৯/১০, সরিষা-১৫, সোনালি সরিষা (এসএস-৭৫) জাতের সরিষাও আবাদ হয়। সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, মাগুরা, নাটোর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জ, পাবনা, নড়াইল ও সুন্দরবন এলাকা ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা এ বছর টাঙ্গাইল জেলায় ১৫ হাজার ৯৮৫টি বাক্স বসিয়েছেন। ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৯৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করা হয়েছে। দিন দিন মধু সংগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছে কৃষি অফিস।

মৌচাষিরা জানান, টাঙ্গাইল থেকে মধু সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে খুচরা ও ঢাকায় পাইকারি বিক্রি করা হয়। প্রতি কেজি মধু বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে।

সরেজমিনে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ভাটচান্দা, গালা, পিচুরিয়া, সদুল্যাপুর, রসুলপুরসহ বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রাম বাংলার আবাদি জমিতে এখন হলুদের মেলা। মাঠে মাঠে ফুটে আছে সরিষা ফুল। এতে তৎ্পর হয়ে উঠেছে মৌসুমি মধু সংগ্রহকারীরাও। মৌমাছির গুঞ্জনে মুখরিত পরিবেশ।

কৃষি অফিসাররা জানান, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছির বাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করলে সরিষায় পরাগায়নের ফলে আবাদ শতকরা ১৫ থেকে ২০ ভাগ বেশি হয়। ফলন ভালো হলে প্রতি বিঘা জমিতে ৫-৬ মণ সরিষা পাওয়া যায়।

মৌচাষি বেল্লাল হোসেন, ইয়াসিন মিয়া ও বাবু মিয়া জানান, তারা বিসিকের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সারাবছরই ভ্রাম্যমাণভাবে মধু সংগ্রহ করেন তারা। লিচু, ধনিয়া, কালোজিরাসহ বিভিন্ন ফুল থেকে তারা মধু সংগ্রহ করে থাকে। চলতি সরিষা মৌসুমে তারা সাতক্ষীরা থেকে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার ভাটচান্দা গ্রামে ১৬০টি বাক্স বসিয়েছেন। প্রতি বাক্স থেকে ৮/১০ দিন পর ২ থেকে ৫ কেজি মধু পাওয়া যায়। এপর্যন্ত ২৫ দিনে তারা ৬ মন মধু পেয়েছেন। মধু বড় বড় কোম্পানিতে বিক্রি করে থাকেন।

আজগর আলী, সেকান্দার হকসহ একাধিক কৃষক জানান, সরিষা চাষে প্রতি বিঘা জমিতে ব্যয় হয় ৪-৫ হাজার টাকা। ফলন ভালো হলে প্রতি বিঘা জমিতে ১০-১২ হাজার টাকা লাভ করা যায়। সরিষা ক্ষেতে ‘জাত’ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য অনুমোদিত কীটনাশক ব্যবহার করতে হয়। এঁটেল মাটিতেও সরিষা চাষ হয়। এঁটেল-দো-আঁশ মাটিতে সরিষার চাষ সবচেয়ে ভালো হয়। এবার সরিষার ফলন ভালো হওয়ায় টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকায় মধু আহরণও আশানুরূপ হচ্ছে। তাদের দাবি, মৌ চাষের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য মৌচাষের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং মৌচাষিদের সহজে ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হলে মধু সংগ্রহ আরও ব্যাপক আকারে করা যাবে। একইসঙ্গে সরিষার আবাদও অনেক বেড়ে যাবে।

এবিষয়ে টাঙ্গাইল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আহসানুল বাসার বলেন, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় এবার ৪৫ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ৫০ হাজার ৪৮৮ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। গত দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় আমন ধান চাষ ভালো না হওয়ায় কৃষকরা সরিষা আবাদের মাধ্যমে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি আরও বলেন, সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌবাক্স স্থাপন করা হলে মৌমাছির কারণে পরাগায়নে প্রায় ২০ শতাংশ ফলন বেশি হয়ে থাকে। প্রতি বছরই ৩৫-৪৫ ভাগ জমিতে মৌবাক্স স্থাপন করা হয়। সরিষার বাজার ভালো থাকায় চাষিদের ও মৌবাক্স স্থাপনকারীদের উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

Facebook Comments Box