ইয়াওমুল খামিছ (বৃহস্পতিবার), ০৫ আগস্ট ২০২১

বড় জাহাজ উত্তোলনের সক্ষমতা নেই বিআইডব্লিউটিএ’র

বড় জাহাজ উত্তোলনের সক্ষমতা নেই বিআইডব্লিউটিএ’র

বরিশাল সংবাদদাতা: নৌ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী জাহাজের ওজন তিন হাজার থেকে চার হাজার টন। ডুবে গেলে পানি এবং মালামালসহ জাহাজের ওজন আরও বেড়ে যায়। এ ধরনের কোনও জাহাজ ডুবে গেলে তা উত্তোলনের সক্ষমতা নেই বিআইডব্লিউটিএ’র। কারণ, বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ আছে চারটি, এগুলো একত্র করলে সর্বোচ্চ ৬২০ টন পর্যন্ত ডুবন্ত জাহাজ উত্তোলন করা সম্ভব। এ কারণে ডুবন্ত জাহাজ উত্তোলনে আরও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ কেনার দাবি জানিয়েছেন জাহাজ মালিকসহ সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, দেশে উদ্ধারকারী জাহাজ রয়েছে চারটি। এর মধ্যে ‘নির্ভিক’ ও ‘প্রত্যয়’ নামে দুটি জাহাজের উত্তোলন ক্ষমতা সর্বোচ্চ ২৫০ টন থেকে ৫শ’ টন। অন্য দুটি জাহাজ ‘হামজা’ ও ‘রুস্তম’ এর ক্ষমতা ৬০ টন করে ১২০ টন। তবে শেষের দু’টি জাহাজ অনেক দিনের পুরনো হওয়ায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

গত ১৪ ডিসেম্বর কীর্তনখোলা নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে ১২শ’ টন ক্লিংকারসহ এমভি হাজি মোহাম্মদ দুদু মিয়া-১ কার্গো ডুবে যায়। কার্গোটির ওজন ৬শ’ টন। ক্লিংকার ও পানির কারণে কার্গোটির ওজন আরও ২শ’ মেট্রিক টন বেড়েছে। এ অবস্থায় কার্গোটি উদ্ধারের সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও উদ্ধারকারী জাহাজ ‘নির্ভিক’ ডুবে যাওয়া কার্গোর পাশে দুই দিন অবস্থানের পর গন্তব্যে ফিরে যায়।

‘দুদু মিয়া’ কার্গো কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার আনসার আলী বলেন, ‘বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজ কোনোভাবেই ডুবে যাওয়া কার্গো উত্তোলন করতে পারবে না। এ জন্য বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমডোর এম. মাহাবুবুল ইসলাম আমাদের একমাসের সময় বেঁধে দিয়েছেন। আমরা ওই সময়ের মধ্যে বিকল্প পন্থায় কার্গোটি উত্তোলনের পদক্ষেপ নিয়েছি। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে আমাদের চুক্তি হচ্ছে। তারা প্রথমে কার্গোর মধ্য থেকে ক্লিংকার উত্তোলন করবে। এরপর কার্গোটি নদীতে ভাসিয়ে দেবেন। এ জন্য ওই সংস্থার ডুবুরি দল কার্গোর অবস্থান পরিদর্শন করেছে। এখন দরদামের মাধ্যমে বিষয়টি ফয়সালা হবে।’

এর আগে, ২০১৭ সালের ২২ এপ্রিল নগরীর চরবাড়িয়া সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতে দুটি নৌযানের মুখোমুখি সংঘর্ষে ডুবে যাওয়া কয়লাবোঝাই বাল্কহেডটিও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালের আগস্টে পদ্মার মাওয়া পয়েন্টে ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ লঞ্চটিও উদ্ধারে ব্যর্থ হয় বিআইডব্লিউটিএ। এভাবে উদ্ধারকারী জাহাজের অক্ষমতার বহু উদাহরণ রয়েছে।

লঞ্চ মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, ‘সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর দেশে সর্বোচ্চ চার হাজার টন ওজনের জাহাজ নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছে। বিশেষ করে বরিশাল-ঢাকা নৌ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী এক একটি জাহাজের ওজন তিন থেকে চার হাজার টন। আর বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী জাহাজের উত্তোলন ক্ষমতা রয়েছে মাত্র আড়াইশ’ টন ।’ যেকোনও ধরনের বিপদ মোকাবিলায় ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহের দাবি জানান এ ব্যবসায়ী নেতা।

বরিশাল বিভাগ উন্নয়ন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কামাল উদ্দিন বলেন, ‘বরিশাল-ঢাকা নৌরুটে রোটেশন পদ্ধতি বাতিল এবং ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজের জন্য আমরা আন্দোলন করেছি। কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। কাজ হবে যখন বড় ধরনের বিপদ আসবে তখন উদ্ধারকারী জাহাজের জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু হবে।’ যাত্রীবাহী জাহাজের নিরাপত্তায় জরুরি ভিত্তিতে ক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহের দাবি জানান তিনি।

আড়াইশ’ টনের ওপর উদ্ধারকারী জাহাজ না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ কেনার চিন্তাভাবনা করছে।’

ডুবন্ত নৌযান উদ্ধারে কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা এবং অক্ষমতা স্বীকার করে বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম পরিচালক (উদ্ধার) ফজলুর রহমান বলেন, ‘সংস্থার উদ্ধার ইউনিট যুগোপযোগী করতে ২ হাজার টন এবং দেড় হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল বিশেষজ্ঞকে প্রাথমিক সমীক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই নতুন দুটি উদ্ধারকারী জাহাজ কেনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।’

দেশে ৬০ টন উত্তোলন ক্ষমতাসম্পন্ন হামজা কেনা হয় ১৯৬৪ সালে, আর রুস্তম কেনা হয় ১৯৮২ সালে। অর্ধশত বছরের পুরনো হামজা আর ৩৭ বছরের পুরনো রুস্তম এখন অকার্যকর। সবশেষ ২০১২ সালে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কোরিয়া থেকে আনা উদ্ধাকারী জাহাজ ‘নির্ভিক’ ও ‘প্রত্যয়’ এর উত্তোলন ক্ষমতা ২৫০ টন করে। কিন্তু কারিগরি জটিলতার কারণে এ দু’টি জাহাজ একসঙ্গে উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে পারে না।

Facebook Comments Box