আরবিয়া (বুধবার), ১৭ আগস্ট ২০২২

কাশ্মীরে ইসরাইলের ফিলিস্তিননীতি বাস্তবায়ন করছে ভারত

কাশ্মীরে ইসরাইলের ফিলিস্তিননীতি বাস্তবায়ন করছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৯৪৭ সালের পর প্রথমবারের মতো কাশ্মীরের আবাসননীতির পরিবর্তন করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাদের এমন পদক্ষেপে যে কোনো সময় ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।

মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকারের উদ্দেশ্য মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের জনমিতি এবং তাদের আত্মপরিচয় মুছে ফেলা। যেভাবে ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি স্থাপনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, পরিচয়কে হুমকিতে ফেলেছে ইহুদিবাদীরা। বলেছেন, বিশেষজ্ঞরা।

কাশ্মীরের ১৪ লাখ বাসিন্দার জন্য মোদি প্রশাসন কি কি আইন পাস করেছে; সেগুলোর বাস্তবায়ন কোন পর্যায়ে, দেখা নেয়া যাক এএফপির প্রতিবেদনে।

এ পর্যন্ত কাশ্মীরে মোদি যা করেছেন

১৯৪৭ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর কাশ্মীরে ভাগ বসায় ভারত ও পাকিস্তান। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে স্বাধীনতাকামী এবং ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাতে ১৯৮৯ সালের পর প্রায় ১ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। যাদের অধিকাংশই সাধারণ নাগরিক।

কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ মুসলিম। উপত্যকাই ভারতবিরোধিতার মূলকেন্দ্র। বাসিন্দাদের প্রায় শতভাগ ভারতের শাসনবিরোধী।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট মোদি সরকার সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ৩৫’র এ ধারা ভারতীয় সংবিধান থেকে বাতিল করে দেয়। যে আইনের অধীনে আংশিক স্বায়ত্তশাসন, নিজস্ব পতাকা, সংবিধানসহ অন্যান্য সুবিধা ভোগের অধিকার ছিল কাশ্মীরীদের।

এরপর আরোপ করা হয় কঠোর বিধিনিষেধ। নতুন করে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ সেনা। কাশ্মীরে মোতায়েন করা নিরাপত্তা বাহিনীর মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ লাখ। কারফিউ’র মতো অবরোধ আরোপ করা হয়। আটক করা হয় হাজার হাজার বাসিন্দাকে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে মোবাইল, ইন্টারনেট সংযোগসহ যোগাযোগের সব ব্যবস্থা।

জম্মু এবং কাশ্মীরকে আলাদা কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। লাদাখকে বানানো হয় আলাদা প্রশাসনকি অঞ্চল।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ইচ্ছায় কাশ্মীরকে টুকরো টুকরো করা হয়। কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনটি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি’র ঘনিষ্ঠমিত্র।

মোদি সরকারের এমন পদক্ষেপে আবারো হুমকিতে পড়ে ভারতের ২০ লাখ মুসলমান ভবিষ্যত নিরাপত্তা। বিস্মিত হন দেশটির অসাম্প্রদায়িকতাপন্থীরা। মোদি ভারতকে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করছেন কীনা- এ নিয়ে শঙ্কিত তারা। যদিও কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মোদি।

দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীর নিয়ে গবেষণা করা সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক মোনা ভান এএফপিকে বলেন, আমার কাছে মনে হয়েছে কাশ্মীরে হিন্দুবসতি নির্মাণের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে।

কাশ্মীরের বিশেষ বিধিবিধানের যা হয়েছে

১৯২৭ সাল থেকে কাশ্মীরীরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন। যার মধ্যে রয়েছে-শুধু স্থানীয়রা ভূমি এবং সম্পদের মালিক হবেন। সেখানকার সরকারি চাকরি তাদের জন্য বরাদ্দ থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনগুলো কাশ্মীরী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারতেন কাশ্মীরীরা। বাসিন্দাদের জন্য নির্ধারিত সেই বিশেষ সুবিধা বাতিল করেছে নরেন্দ্র মোদি প্রশাসন।

এখন ভারতের যে কোনও প্রান্তের বিভিন্ন শ্রেণির লোকেরা কাশ্মীরের আবাসিক সনদের জন্য আবেদন করতে পারবে। ভোগ করতে পারবে কাশ্মীরীদের পাওয়া সুবিধা।

এ সুবিধায় অন্তর্ভুক্ত হবেন পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা ২৮ হাজার শরণার্থীসহ ১৭ লাখ ৫০ হাজার অভিবাসী শ্রমিক। কাশ্মীরে তাদের ১৫ বছর ধরে বসবাস। যাদের অধিকাংশই হিন্দুধর্মাবলম্বী।

এ প্রক্রিয়ায় সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী যারা, সাত বছর ধরে কাশ্মীরে রয়েছেন, তাদের সন্তান, যারা স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, তারাও স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পাবে।

ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিদ্দিক ওয়াহিদ এএফপিকে বলেন, এই পরিবর্তনগুলো ১৯৪৭ সালের পর থেকে কঠোরভাবে চাপানো হয়েছে। জনসংখ্যার পরিসংখ্যান পাল্টানোর জন্য কাশ্মীরকে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের এখন যা করতে হবে

কাশ্মীরীদের এখন আবাসন সার্টিফিকেট পেতে নতুন নিয়মে আবেদন করতে হবে। প্রমাণ করতে হবে তারা স্থায়ী বাসিন্দা। নতুন নিয়মে স্থায়ী বাসিন্দা হতে গেলে তাদেরকে পারমানেন্ট রেসিডেন্ট সার্টিফিকেট (পিআরসি) দেখাতে হবে। ১৯২৭ সাল থেকে যা মেয়াদোত্তীর্ণ। পরে পিআরসি সার্টিফিকেট অকার্যকর হয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাশ্মীরের এক প্রকৌশলী জানান, জীবিকার জন্য ভারতের রাজনীতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশে বাধ্য হচ্ছে তরুণ কাশ্মীরীরা। তারা বলে, তোমার চাকরির দরকার। ঠিক আছে। আগে আবাসনের কাগজপত্র দেখাও।

সরকারের সিদ্ধান্তে খুশি যারা

বাহাদুর লাল প্রজাপতি। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বলেন, ৭ দশক আগে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত-পাকিস্তানের প্রথম যু্দ্ধের সময় কিছু হিন্দু পাকিস্তানে আশ্রয় নেন। অবশেষে তারা কাশ্মীরে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য আনুষ্ঠানিকবাবে কাগজপত্র পেয়েছে। বলেন, এমন খুশি তারা কখনো হয়নি।

‘৭২ বছরের সংগ্রামের পর ভারতের নাগরিক হিসেবে এখানে বসবাসের অধিকার পেয়েছি।’ বলেন ৫৫ বছর বয়সী প্রজাপতি। হিন্দু অধ্যুষিত জম্মুতে বসবাস করেন তিনি।

কাশ্মীরে বসবাসের স্থায়ী কাগজপত্র পাওয়াদের একজন নাভিন কুমার চৌধুরি। তিনি বিহার রাজ্যে কর্মরত সরকারের একজন শীর্ষ আমলা। বহু বছর ধরে কাশ্মীরে বসবাস করছেন। প্রথম দিকে যে কয়জন আবাসন সার্টিফিকেট পেয়েছে তাদের একজন।

আবাসনের কাগপত্র পেয়ে সার্টিফিকেট তুলে ধরে সামাজিক মাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেন তিনি। তার এ ছবিতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় কাশ্মীরীরা। তবে মোদিপন্থীরা তাকে স্বাগত জানিয়েছিল।

করোনার সত্ত্বেও ৪ লাখ ৩০ হাজার আবাসন সার্টিফিকেট অনুমোদন দিয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। তবে তাদের মধ্যে কতোজন স্থানীয় বা কতোজন বাইর থেকে আসা তা জানা যায়নি।

স্থানীয়রা অনেকে তাদের পুরানো কাগজপত্র দিয়ে নতুন সার্টিফিকেট নিতে চাচ্ছেন না। এতে করে তাদের কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কেউ কেউ আবার প্রতিবেশীদের তিরস্কারের ভয়ে গোপনে আবাসন সার্টিফিকেট নিচ্ছেন।

ভারতবিরোধী তকমা পাওয়ার ভয়ে অনেকে মুখ খুলে কথাও বলছেন না। কেউ কেউ বন্ধ করে দিয়েছেন সামাজিক মাধ্যমে থাকা তাদের অ্যাকাউন্ট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাশ্মীরী শিক্ষার্থী জানান, এটা খুবই হাস্যকর। আমাকে আমার ভূমিতে থাকার জন্য বাইর থেকে আসা লোকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে। কর্তৃপক্ষ তার ক্ষতি করতে পারে এমন আশঙ্কায় এএফটির কাছে নিজের নাম প্রকাশ করেনি ওই কাশ্মীরী শিক্ষার্থী।

সূত্র: এএফপি।

Facebook Comments Box